শিক্ষাবিদ সুভাষচন্দ্র

[ জয়শ্রী-কর্তৃক প্রকাশিত “নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু জন্মশতবার্ষিকী গ্রন্থ” -এ এই শিরোনামে

সুমিত মুখোপাধ্যায়ের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল। তার-ই অনেকাংশ নিয়ে লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হল। জীবনে শিক্ষার ভূমিকা কী, কি হওয়া উচিত – সেই পর্যালোচনা আজ-ও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক।]

সুভাষচন্দ্রের জ্বলন্ত দেশপ্রেম আমাদের নিকট নিত্য প্রেরণার বস্তু। আজাদ-হিন্দ ফৌজের অমিতবীর্য সর্বাধিনায়ক হিসাবে তাঁর কীর্তিকথা আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। ‘বীর সুভাষ’ কথাটি এতই প্রচলিত হয়ে গিয়েছে যে সুভাষচন্দ্রকে এক দুঃসাহসী বীরপুরুষ ছাড়া অন্য কিছু আমরা ভাবতেই পারি না। সুভাষচন্দ্রের অগ্নিদীপ্ত বীরত্বকে এতটুকু ছোটো না করে এ কথা বলার সময় এসেছে যে এ-ই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। সুভাষচন্দ্র ছিলেন বহুগুণান্বিত মানুষ যাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল বহু বৈশিষ্ট্য-সমন্বিত। সর্বোপরি তাঁর ছিল এক চিন্তাশীল দার্শনিক মন। নিজদেশের নানা সমস্যা নিয়ে তিনি গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করেছিলেন এবং নিজ বিবেচনা অনুযায়ী তার সমাধান নির্দেশ করেছিলেন। শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর চিন্তা বর্তমান যুগের শিক্ষাক্ষেত্রের সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। …

ছাত্রাবস্থায় সুভাষচন্দ্র স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হন এবং কটক থেকে নিজ মাতৃদেবীকে লেখা পত্রাবলীতে একটি কথাই বার বার ঘুরেফিরে এসেছে যে শিক্ষার লক্ষ্য কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করা নয়। জীবনের এক বৃহত্তর আদর্শ আছে এবং তাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে হবে। … একস্থানে তিনি লিখেছেন: “লেখাপড়ার উদ্দেশ্য বুদ্ধিবৃত্তি পরিমার্জিত করা এবং সদসৎ বিবেচনাশক্তি দেওয়া- এই দুই উদ্দেশ্য সফল হইলে লেখাপড়া সার্থক হইবে। লেখাপড়া শিখিয়াও যদি কেহ দীনচরিত্র হয় তবে তাহাকে কি পণ্ডিত বলিব? কখনই নয়। আর যদি কেহ মুর্খ হইয়াও বিবেকাধীন হইয়া চলিতে পারে, তবে তাহাকে বলিব মহাপণ্ডিত। …  প্রকৃত জ্ঞান ঈশ্বরজ্ঞান আর সমস্ত জ্ঞান অজ্ঞান।” এখানে কেবলমাত্র বিবেকানন্দ নন, রামকৃষ্ণদেবের কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। … মনে হয় এ যেন স্বয়ং বিবেকানন্দের কথা।

১৯১৩ সালে রাঁচি থেকে লেখা এক পত্রে তিনি লিখেছেন: “…  চরিত্রগঠনই ছাত্রের প্রধান কর্তব্য- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা চরিত্র গঠনকে সাহায্য করে আর কার কিরূপ উন্নত চরিত্র তাহা কার্যেই বুঝিতে পারা যায়। বই পড়া বিদ্যাকে আমি সর্বান্তঃকরণে ঘৃণা করি। আমি চাই চরিত্র, জ্ঞান, কার্য।” স্বভাবতই মনে পড়ে যায় যুবসমাজের প্রতি বিবেকানন্দের বজ্রনির্ঘোষ ‘তোমরা তোমাদের মূল্যহীন ডিগ্রী আর গাউন সমুদ্রের জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মানুষ হও।” … 

সুভাষচন্দ্র যখন আই. সি. এস.-এর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দেশে ফিরে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপ দিলেন সে সময় তাঁর ভবিষ্যৎজীবন সম্পর্কে তেমন কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না, তবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনকে লেখা তাঁর দুটি চিঠি থেকে মনে হয় যে তিনি গঠনমূলক কাজের মধ্যে দিয়ে স্বদেশসেবার সুযোগ চেয়েছিলেন এবং শিক্ষকতা সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। … সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার কথা চিন্তা করেছিলেন এবং জাতীয় কলেজে শিক্ষকতা, গ্রাম্য সমিতি স্থাপন, জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ইত্যাদির মাধ্যমে ইতিবাচক কাজ করতে চেয়েছিলেন। … 

… 

এই প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে শ্রীঅরবিন্দের জীবনের এক আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়। শ্রীঅরবিন্দ বিলাত থেকে দেশে ফেরার পর শিক্ষকতার কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং বরোদা কলেজে যোগদান করেন। কিছুকাল বাদে তিনি ঐ কলেজের উপাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। কিন্তু দেশের ডাকে সাড়া না দিয়ে তিনি থাকতে পারেন নি, তাই যশ, মান প্রতিপত্তির লোভকে হেলাভরে উপেক্ষা করে তিনি কলকাতার সদ্যপ্রতিষ্ঠিত জাতীয় কলেজে যোগদান করেন। তিনি সুনিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজ জন্মভূমির প্রতি অনুরাগ যদি সঞ্চারিত না হয় তা হলে কোনো শিক্ষাই সম্পূর্ণ হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতান্তরের ফলে তিনি জাতীয় কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে ইস্তফা দেন। বিদায়কালে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন। ‘তোমরা মহান হও। কিন্তু তোমাদের মহান হওয়া তোমাদের নিজেদের জন্য নয়। তোমাদের আপন অহংকারের পরিতৃপ্তির জন্য নয়। তোমাদের মহান হতে হবে দেশের জনা, ভারতের জন্য। দেশের সেবায় তোমরা আত্মনিয়োগ করবে, ভারতকে গৌরবান্বিত করবার শপথ নেবে… মাতৃসেবায় সমস্ত জ্ঞান, শিক্ষা, বিদ্যাবুদ্ধি নিয়োগ করতে হবে।’ সুভাষচন্দ্রের ‘তরুণের স্বপ্নে’র মূল সুরের সঙ্গে অরবিন্দের এই কথাগুলি সহজেই মিলিয়ে নেওয়া যায়। বিবেকানন্দের মতো অরবিন্দও বলেছিলেন: ‘To bring out the real man, is the first business of education. The chief aim of education should be to help the growing soul to draw out that in itself which is best and make it perfect for a noble use.”

বিবেকানন্দ, অরবিন্দ এবং সুভাষচন্দ্র, তিনজনেরই শিক্ষাদর্শন মানুষের অন্তর্নিহিত দেবত্বকে কেন্দ্র করে বিবর্তিত হয়েছিল। বিবেকানন্দ বলেছিলেন: ‘Education is the manifestation of perfection already in man.’ অরবিন্দ সেই সুরে সুর মিলিয়ে বলেছিলেন: ‘Everyone has in him something divine, something his own, a chance of perfection and strength in however small a sphere God offers him to take or refuse.’

হুগলী জেলা সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ২১.৭.২৯.১৯ তারিখে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন ‘হে বাঙালার ছাত্র ও তরুণ সমাজ! তোমরা পরিপূর্ণ অখণ্ড মুক্তির উপাসক হও। তোমরাই ভবিষ্যৎ ভারতের উত্তরাধিকারী, অতএব তোমরাই সমস্ত জাতিকে জাগাইবার ভার গ্রহণ করো। তোমাদের প্রত্যেকের আছে অনন্ত অপরিসীম শক্তি। এই শক্তির উদ্বোধন করো এবং এই শক্তিকে অপরের মধ্যে সঞ্চারিত করো।’

মান্দালয় কারাগৃহে বন্দীজীবন যাপন কালে সুভাষচন্দ্র শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর চিন্তাভাবনা বিস্তারিতভাবে ব্যক্ত করেন ঐ সময়কার পত্রাবলীর মধ্যে। তা ছাড়া এই সময় তাঁর নিজস্ব ‘Prison Diary’তে বিবিধ বিষয়ের উপর তাঁর মতামত তিনি লিপিবদ্ধ করেন। কারাবরণ কালে সুভাষচন্দ্রের শিক্ষাচিন্তার উল্লেখযোগ্য বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এতদিন যা ছিল বিবেকানন্দ ও অরবিন্দের প্রভাবে আচ্ছন্ন সেখানে এক নূতন মাত্রা সংযোজিত হল, তা হল। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনের প্রভাব।

রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন শিক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের সহজাত প্রতিভার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ। শিক্ষাব্যবস্থা যেন কখনো তাদের কাছে ভারবহ মনে না হয় সে বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষাকে এক আনন্দের বস্তুতে রূপান্তরিত করতে যার দ্বারা ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ের প্রথম থেকেই তাদের সৃজনশীল প্রতিভাকে নিজস্ব ভঙ্গিতে বিকশিত করতে পারবে। এর ফলে তারা সমাজসচেতন হয়ে উঠবে। প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য হল মানুষের অন্তর্জগতের ঐক্যসাধন। এর ফলে মানুষ হয়ে ওঠে সত্যদ্রষ্টা, সৌন্দর্যের পূজারী এবং সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের পথে পরিচালিত। অজিতকুমার চক্রবর্তীকে তিনি লিখেছিলেন: ‘The minds of the children today are almost deliberately made incapable of understanding other people with different languages and customs. This causes us to grope after each other in darkness.”

… 

মান্দালয়ের কর্মীজীবন সুভাষচন্দ্রের জীবনের এক অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই সময়েই চিন্তানায়ক সুভাষচন্দ্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। শিক্ষাবিদ সুভাষচন্দ্রের পরিচয় ইতিপূর্বে পাওয়া গেলেও শিক্ষাসম্বন্ধীয় প্রকৃত বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার স্বাক্ষর তিনি রেখেছিলেন মান্দালয়ে বন্দীজীবন যাপন কালে। বর্তমান শিক্ষাজগতের সংকটমোচনের পথনির্দেশ পাওয়া যাবে সুভাষচন্দ্রের বন্দীজীকাকালের পত্রাবলীর মধ্যে।

কারারুদ্ধ হওয়ার পূর্বে সুভাষচন্দ্র দক্ষিণ কলিকাতা সেবাশ্রমের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। তারও আগে নিজের ছাত্রাবস্থায় ১৯১৬ সালে তিনি বস্তির ছেলেদের জন্য দুটি নৈশবিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর চারুচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় যিনি এই কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, সুভাষচন্দ্রের এই প্রয়াসকে গণশিক্ষার মাধ্যমে বৈপ্লবিক চেতনা প্রসারের উদ্যোগ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এই চিন্তা বিস্তৃততর প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হয়েছিল মান্দালয়ে কারাবরণকালে। তারও আগে কর্পোরেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ হিসাবে তিনি যেটুকু কাজ করবার সুযোগ পেয়েছিলেন তার মধ্যেই অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের জন্য তিনি সচেষ্ট ছিলেন। ফলে ১৯২৪ থেকে ১৯৩০-এর মধ্যে বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৯ থেকে বেড়ে ২১৮তে দাঁড়ায়। পাঁচটি মডেল স্কুল এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি কলেজ স্থাপিত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এই দীর্ঘ সময়ের প্রায় সবটুকুই সুভাষচন্দ্র কাটিয়েছিলেন কারাগৃহে কিন্তু সেখান থেকেই তিনি নানা প্রস্তাব ও উপদেশের মাধ্যমে শিক্ষার বিস্তারের এই উদ্যোগকে অব্যাহত রাখেন।

মান্দালয় থেকে … হরিচরণ বাগচিকে এক পত্রে তিনি লিখেছেন যে সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য ব্যায়াম চর্চা ও নিয়মিত পাঠ প্রয়োজন। এর জন্য প্রত্যেকদিন সময় নির্দিষ্ট করা উচিত। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে তিনি এই পত্রে লিখেছেন যে এই শিক্ষা প্রধানত ইন্দ্রিয়নির্ভর। তাই কোনো বিষয় শেখাতে গেলে সেই জিনিসগুলি চোখের সামনে করতে হয়। পক্ষান্তরে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এমন অনেক কিছু শেখাতে হয় যা ছাত্র কখনো দেখে নি। কিন্তু নিজের চিন্তাশক্তির সাহায্যে তা বুঝতে পারে।

…  তাঁর ভাষায় ‘প্রকৃতির নিয়ম অনুসরণ করে আমরা যদি সকল ইন্দ্রিয়ের দ্বারা জ্ঞান জন্মাতে পারি তবে ফললাভ খুব শীঘ্র হবে। পাটীগণিত শেখবার সময় শুধু মুখস্থ না করিয়ে যদি কড়ি মারবেল অথবা ইটপাথরের টুকরা দিয়ে আমরা যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ প্রভৃতির উদাহরণ দেখাতে পারি, তবে সেই সব জিনিষ শিশুরা খুব শীঘ্র শিখতে পারবে।’

এ ছাড়া শিল্পশিক্ষার মাধ্যমে সহজাত সৃষ্টিশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। পুতুল তৈরি করা, মাটি দিয়ে মানচিত্র তৈরি, ছবি আঁকা, ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে ছেলেদের মধ্যে সৃষ্টির আনন্দ সঞ্চারিত করা সম্ভব। এর ফলে লেখাপড়া সম্পর্কে তাদের ভীতি দূর হয়ে যায় এবং বুদ্ধির স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ ঘটে। উপরন্তু তাদের মধ্যে মৌলিক সৃজনশীল ক্ষমতার ব্যাপক প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য প্রাথমিক পর্যায়ে টেক্সট্ বুক-এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি। তিনি বাস্তব প্রশিক্ষণ বা practical training-এর ওপর জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘গাছপালা, ফুল প্রভৃতি সম্বন্ধে যখন শেখাবে তখন যেন সামনে গাছপালা এবং ফুল থাকে। আকাশ, তারা, প্রভৃতি সম্বন্ধে যখন শেখাবে তখন মুক্ত আকাশের তলে নিয়ে গিয়ে তাদের শিক্ষা দিবে। যখন ভূগোল শিখাবে তখন মানচিত্র, গ্লোব যেন থাকে, ইতিহাস যখন শেখাবে তখন সুবিধামতো museum প্রভৃতি স্থানে নিয়ে যাবে’। তিনি আরো বলেছিলেন যে প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক নীতিগুলি হৃদয়ংগম না করলে আদর্শ শিক্ষক হওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষককে অন্তরের ভালোবাসা ও সহানুভূতি দিয়ে এবং ছাত্রের দিক থেকে সব-কিছুকে দেখতে হবে। সর্বোপরি ছাত্রের অবস্থায় নিজেকে কল্পনা করতে হবে। নচেৎ ছাত্রদের অসুবিধাগুলি তাঁর পক্ষে বোঝানো সম্ভব হবে না। শিক্ষার তিনটি প্রধান উপাদান হল শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, শিক্ষার প্রণালী এবং শিক্ষাবিষয়ক পাঠ্যপুস্তক। প্রায় একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়, শ্রীঅরবিন্দের শিক্ষাদর্শনের মধ্যে: ‘… It can be done by promoting powers of observation, memory etc. The second thing that acts is the personality of the teacher.’

… 

সুভাষচন্দ্র শিক্ষা বলতে কেবলমাত্র গতানুগতিক বিদ্যাভ্যাস বোঝাতে চান নি। তাঁর মতে প্রকৃত সর্বাঙ্গীণ শিক্ষার অন্যতম উপাদান হল শরীরচর্চা। স্বাস্থ্যগঠনের মাধ্যমেই চরিত্রগঠন সম্ভব। পরীক্ষায় উচ্চস্থান অধিকার করলেই বলিষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী হওয়া যায় না। ১৯২৯-এর ২৯ নভেম্বর নাগপুরে যুব সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন: ‘If we are to rejuvenate the body, we shall need sports, athletics and gymnastics. If we are to emancipate and re-educate the mind, we shall need a new literature, a higher and better type of education and a healthy conception of morality.’ লাহোরের যুব সম্মেলনে ১৯.১০.১৯২৯ তিনি বলেন, ‘For advancing the cause of student’s welfare, items in your programme would be physical culture societies, gymnasiums, libraries etc.

…  ২৯.১২.১৯২৯ জেলা যুব-মেদিনীপুর সম্মেলনে তিনি ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে গণশিক্ষার কথা বলেছিলেন। সকলেই সেখানে শিক্ষার সমান সুযোগ পাবে। উচ্চ শিক্ষা সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র ছিলেন সদাসচেতন। The Indian Struggle গ্রন্থে তিনি লিখেছেন: ‘Elementary education must be given to the masses and along with that more facilities must be offered to the intellectual masses in the matter of higher education.”

বিবেকানন্দ ও সুভাষচন্দ্র উভয়েই কারিগরী শিক্ষা বা Technical education-এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। বিবেকানন্দ জামশেদজী টাটার সঙ্গে আলোচনাকালে এক গবেষণাকেন্দ্রের পরিকল্পনা করেছিলেন নিজ গুরুভ্রাতাদের শিল্পবিষয়ক প্রশিক্ষণ, বা industrial education-এর জন্য। এ সম্পর্কে টাটার সঙ্গে তাঁর পত্রবিনিময়ও হয়েছিল। তিনি শিক্ষিত যুবকদের কারিগরী শিক্ষার জন্য জাপানে পাঠাবার কথাও ভেবেছিলেন। ২১.৮.১৯৩৮ ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ অ্যাসোসিয়েশনে তিনি বিশেষভাবে কারিগরী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন এবং বিবেকানন্দের মতো তিনিও ভারতীয় ছাত্রদের জাপানে পাঠাবার প্রস্তাব রেখেছিলেন।

জার্মানির While and Machi পত্রিকায় ‘Free India and her problems’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে সুভাষচন্দ্র লিখেছিলেন যে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচিত অল্পবয়স থেকে ছাত্রছাত্রীদের মনে জাতীয় ঐক্যের উপলব্ধি গড়ে তোলা। এখানে তিনি রাজনৈতিক সামাজীকরণের মাধ্যম হিসাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপরিসীম গুরুত্বের উপর আলোকপাত করেছেন। শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের সমস্যার সমাধানের কথা তিনি ভেবেছিলেন। … উপরি-উক্ত প্রবন্ধে সুভাষচন্দ্র বলেছেন যে রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় অর্থ শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য জোগাতে পারে তা হলে নিরক্ষরতা দূর করা আদৌ কষ্টসাধ্য নয়। স্বাধীন ভারতে যুবকগণ শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত হলে এক জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে এ আশা তাঁর ছিল। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের শাস্তিনিকেতনের শিক্ষাশ্রমের কথা তিনি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেছেন।

Related Post