তারিখটা ১৯০৪ এর ২৫শে জুলাই। বঙ্গভঙ্গের আগের বছরের অ্যালবার্ট হল । সেদিন হলের ভেতরে গেরুয়াবসন পরিহিত এক সন্ন্যাসী ব্যাখ্যা করে চলেছেন শ্রীকৃষ্ণতত্ত্ব, ইংরাজীতে। সন্ন্যাসীর ভাষণ শুনতে অ্যালবার্ট হল সেদিন লোকে লোকারণ্য । আগের বছর ডন সোসাইটিতেও সেই সন্ন্যাসীরই বক্তৃতায় বিমুগ্ধ ও ঋদ্ধ হয়েছিলেন সভ্য ও অভ্যাগতবৃন্দ।উপস্থিত সোসাইটির সদস্যরা তাঁর অননুকরণীয় ব্যক্তিত্বের আকর্ষনে কিভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন তা প্রকাশ পেয়েছে অধ্যাপক বিনয় সরকারের লেখনীতে এভাবে - “হেগেলের তর্কপ্রনালীর সাহায্যে প্রাচ্য ওপাশ্চাত্য সংস্কৃতির তুলনা সাধন করছিলেন। একালে আমি যাকে দ্বন্দ্বমূলক বিশ্লেষন’ বলি তিনি তাকে ‘অপবাদ ন্যায়’ বলেছিলেন। ...এ প্রথম দেখলাম । গেরুয়া পরা লোক। পায়ে ছিল না জুতা। কাছা খোলা সাধুর চেহারা। গায়ে জামা নেই, গেরুয়া চাদর। এই মূর্তিতে আমি একটা নয়া দুনিয়ার খবর পেলাম।”
সেই সন্ন্যাসী হলেন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় নামেই সমধিক পরিচিত।
সেদিন বিমুগ্ধ অধ্যাপক সরকারের উপলব্ধি হয়েছিল “… ব্রহ্মবান্ধব আমার অভিজ্ঞতায় সর্বপ্রথম আধুনিক বাঙালি সন্ন্যাসী। কাজেই আমি তাঁর হাবভাবে বিশেষ প্রভাবিত হয়েছিলাম …। অনুকরনযোগ্যও বটে। তাঁর চোখের আর হাঁটার ভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছিল যে, লোকটা চব্বিশ ঘন্টা দুনিয়াকে কলা দেখাচ্ছে। মানুষের মত মানুষ”।
মনে রাখতে হবে ১৯০২ এর অক্টোবরে সামান্য পাথেয় সম্বল করে বিলেত পাড়ি দেওয়া ব্রহ্মবান্ধব ইংল্যান্ড থাকাকালীন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বেদান্ত ও হিন্দু দর্শনের উপর পরের মার্চে ট্রিনিটি কলেজে তিনটি ভাষন দেন। কিন্তু ১৯০৩ এর মাঝামাঝি বিলেত-ফেরত ব্রহ্মবান্ধব কেবল বৈদান্তিক সন্ন্যাসী নন,রাজনীতিপ্রিয় জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীও বটে।
একদা রবীন্দ্রসুহৃদ ব্রহ্মবান্ধবই ১২৫ বছর আগে তাঁর সম্পাদিত সোফিয়া পত্রিকায় ‘দ্য ওয়ার্ল্ড-পোয়েট অব বেঙ্গল’ শীর্ষক এক নাতিদীর্ঘ ইংরাজী প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের কাব্যকৃতির যে অমূল্য মূল্যায়ন করেছিলেন পরবর্তীতে তার ভাষান্তকরনকালে কালিদাস মুখোপাধ্যায়ের উপলব্ধি – রবীন্দ্রপ্রতিভার এমন অকুন্ঠিত স্বীকৃতি ইতিপূর্বে আর কারো লেখায় দেখা যায়নি। উপাধ্যায়ই সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি বলে অভিনন্দিত করেন।
এ মূল্যায়নের তেত্রিশ বছর পরে প্রবাসীর আশ্বিন ১৩৪০ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ‘আশ্রম বিদ্যালয়ের সূচনা’ শীর্ষক সুদীর্ঘ প্রবন্ধে লিখলেন – “উপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। আমার নৈবদ্যের কবিতাগুলি প্রকাশ হচ্ছিল তার কিছুকাল পূর্বে। এই কবিতাগুলি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তাঁর সম্পাদিত Twentieth Century পত্রিকায় এই রচনাগুলির যে প্রশংসা তিনি ব্যক্ত করেছিলেন ,সেকালে সে রকম উদার প্রশংসা আমি আর কোথাও পাইনি।… এই পরিচয় উপলক্ষেই তিনি জানতে পেরেছিলেন আমার সংকল্প , এবং খবর পেয়েছিলেন যে শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাবে আমি পিতার সম্মতি পেয়েছি। তিনি আমাকে বললেন এই সঙ্কল্পকে কার্যে প্রতিষ্ঠিত করতে বিলম্ব করবার কোন প্রয়োজন নেই। তিনি তাঁর কয়েকটি অনুগত শিষ্য ও ছাত্র নিয়ে আশ্রমের কাজে প্রবেশ করলেন। তখনই আমার তরফে ছাত্র ছিল রথীন্দ্রনাথ ও তার কনিষ্ঠ শমীন্দ্রনাথ, আর অল্প কয়েকজনকে তিনি যোগ করে দিলেন। …অধ্যাপনার অধিকাংশ ভার যদি উপাধ্যায় ও শ্রীযুক্তরেবাচাঁদ – তাঁর এখনকার উপাধি অনিমানন্দ – বহন না করতেন তাহলে কাজ চালানো একেবারে অসম্ভব হ’ত। তখন উপাধ্যায় আমাকে যে গুরুদেব উপাধি দিয়েছিলেন আজ পর্যন্ত আশ্রমবাসীদের কাছে আমাকে সেই উপাধি বহন করতে হচ্ছে। … এই সঙ্গে উপাধ্যায়ের কাছে আমার অপরিশোধনীয় কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি”।
তবে হুগলী জেলার খন্যানে ভূমিষ্ঠ মাত্র এক বছর বয়সে মাতৃহারা সমবয়সী রবীন্দ্রনাথের মত পারিবারিক আভিজাত্যহীন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের শৈশব ছিল ভিন্ন প্রকৃতির।
বিবেকানন্দের বাল্যবন্ধু ও ঊনবিংশ শতাব্দীর এই বিশেষ বর্নময় চরিত্রের শিক্ষালাভ হুগলী কলেজিয়েট স্কুল, বিদ্যাসাগর কলেজ ও স্কটিশ চার্চ কলেজ। বাংলা সংস্কৃত, ইংরাজী ছাড়াও তিনি হিন্দী ও ফরাসী ভাষায় ও পারদর্শী ছিলেন। তিনি যে বলশালী ও একসময় ডানপিঠে এবং কুস্তি ও ক্রিকেট খেলায়ও পারদর্শী ছিলেন তা জানা যায় রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শিষ্য রেবাচাঁদের রচনা থেকে। কেশবচন্দ্র সেনের সংস্পর্শে এসে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহন , পরে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এর প্রেরনায় খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহন করে ইউরোপে গিয়ে বেদান্ত প্রচারে সচেষ্ট হন। প্রকাশ করেন ‘সোফিয়া’ পত্রিকা। তবে পরবর্তীতে বিবেকানন্দের প্রেরনায় তিনি হিন্দুধর্মে ফিরে আসেন। বেদান্ত সমালোচক থেকে বেদান্ত প্রেমিকে পরিনত হলেন। একথা বলা হয়ত ভুল হবে না যে, তাঁর জীবনের গতিপথ সর্বদা মসৃণ ছিল না, দুর্লঙ্ঘকে অতিক্রমনের, জয় করার এক অভীপ্সা তাঁকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে সারাজীবন; চিন্তাধারাও অনড় থাকেনি, পরিবর্তিত হয়েছে বারংবার ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাতে, নবোপলব্ধির আলোকবর্তিকায়। তাঁর এই ঘন ঘন ধর্ম পরিবর্তনকে তাঁর অস্থিরচিত্ততার লক্ষণজ্ঞানে তাঁকে ভুল বোঝার, ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের মতে ‘মিসআন্ডারস্টুড’ হওয়ার, অবকাশ হয়ত ছিল। হয়ত সেহেতু জীবনীকার জুলিয়াস লিপনারের মতেও তিনি ‘an enigma of modern India’.
ব্রম্মবান্ধবের পাণ্ডিত্য ছিল যেমন গভীর এবং বিস্ময়কর, তাঁর দেশপ্রেম ছিল নিখাদ। তিনিই সন্ধ্যা পত্রিকায় সর্বপ্রথম ভাষায় ভারতবর্ষের পূর্ন স্বাধীনতার দাবি করেন। ১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি তাঁর সন্ধ্যা পত্রিকায় ওজস্বিনী ও অগ্নিশ্রাবী ভাষায় দেশমাতার পরাধীনতার বন্ধনমোচনের জন্য আত্মোৎসর্গের ডাক দিয়েছিলেন বাংলার যুবসমাজকে। সেই সময় ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকা বিশেষত বাঙ্গালী তরুণদের মধ্যে বিপুল আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। এই বর্নময় চরিত্রের প্রজ্ঞা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের রবীন্দ্রকৃত এক মূল্যায়ন পরিস্ফুট হয়েছে ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসে সন্নিবেশিত ভূমিকা ‘আভাস’এ এভাবে - “তিনি ছিলেন রোমান ক্যাথলিক সন্ন্যাসী, অপরপক্ষে বৈদান্তিক, তেজস্বী, নির্ভীক, ত্যাগী, বহুশ্রুত ও অসামান্য প্রভাবশালী। অধ্যাত্ম বিদ্যায় তাঁর অসাধারন নিষ্ঠা ও ধীশক্তি আমাকে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় আকৃষ্ট করে। শান্তিনিকেতন আশ্রমে বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠায় তাঁকেই আমার প্রথম সহযোগী পাই। এই উপলক্ষে কতদিন আশ্রমের সংলগ্ন গ্রামপথে পদচারন করতে করতে তিনি আমার সঙ্গে আলোচনা কালে যেসকল দুরুহ তত্ত্বের গ্রন্থিমোচন করতেন আজও তা মনে করে বিস্মিত হই”।
রবীন্দ্রনাথের এমত পর্যবেক্ষন থাকলেও স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল পর্বে দুজনের মধ্যে যে এক দূরত্ব রচিত হয়েছিল তা বোধকরি তাঁর জীবদ্দশায় ঘোচেনি। সন্ধ্যা পত্রিকায় ব্রহ্মবান্ধবের ওজস্বিনী ও অগ্নিশ্রাবী ভাষায় দেশমাতার পরাধীনতার বন্ধনমোচনের জন্য আত্মোৎসর্গের ঐ আহবান রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘মদির রস ঢালা’ বলেই বিবেচিত হয়েছিল।
একথা সত্য যে ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকার ভাষা ছিল মেঠো, গ্রাম্যসহজ ও সরস সর্বজনবোধ্য এবং ক্রমে তা অগ্নিগর্ভী হয়ে ওঠে বঙ্গভঙ্গের সময়কালে। ডঃ ভুপেন্দ্রনাথ দত্তের অভিমত ‘প্রাথমিকভাবে যুগান্তর পত্রিকার সুর অতি গুরুগম্ভীর ছিল এবং সন্ধ্যা পত্রিকার অপেক্ষাও চড়া ছিল। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন আরম্ভ হইলে ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকা ক্রমে উগ্রপন্থী হইতে থাকে’। প্রকৃত পক্ষে সেই সময়ে সন্ধ্যা পত্রিকা যেন সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। ব্রম্মবান্ধবের পান্ডিত্য ছিল যেমন গভীর এবং বিস্ময়কর, তাঁর দেশপ্রেম ছিল নিখাদ। তিনিই সন্ধ্যা পত্রিকায় সর্বপ্রথম ভাষায় ভারতবর্ষের পূর্ন স্বাধীনতার দাবি করেন। ঐতিহাসিক ডঃ রমেশ্চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন – “Day in and day out Sandhya went on proclaiming, we want complete independence “.
অনেকের মতে ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসের ইন্দ্রনাথের চরিত্রে সাতাশ বছর আগে মারা যাওয়া ব্রহ্মবান্ধবের ছায়া লক্ষ্য করা যায়। এ নিয়ে অবশ্য সমালোচনার ঝড় উঠেছিল যা এক পৃথক অধ্যায়, বহু বিতর্কিত ও আলোচিত যার বিস্তৃত আলোচনা পর্বান্তরে হতে পারে ।
তবু এ উল্লেখ করতেই হয় যে, ঐ উপন্যাসের প্রথম সংস্করণে মুখপত্র হিসেবে রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখা ‘আভাস’এ ব্রহ্মবান্ধব প্রসঙ্গে যে উল্লেখ ছিল – ‘চৌকাঠ পর্যন্ত গিয়ে একবার মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালেন বললেন, রবিবাবু আমার খুব পতন হয়েছে’। জনমনে সঞ্চারিত ক্ষোভ অনুভবে দ্বিতীয় সংস্করণে ভূমিকা ‘আভাস’ বিযোজিত হলেও উপন্যাসের জন্য সারা বাংলাদেশে বিশেষত বাংলার বিপ্লবী সমাজে রবীন্দ্রনাথ সমালোচিত হয়েছিলেন তীব্রভাবে। তবে ‘পতন’ যে কোনভাবেই বিপ্লবপন্থার সাথে সম্পর্কিত ছিল না তা শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত দেশের ও ‘সন্ধ্যার’ প্রচারের কাজই চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্রহ্মবান্ধবের আশায়ই সুপরিস্ফুট।
অনেকমতে শক্তিমত্ত ইংরেজ শাসক জাতির প্রতি আমাদের যে জন্মগত সমীহ ও সম্মোহন তার ভিত্তিমূলেই তিনি আঘাত করতে চেয়েছিলেন। তিনি এক স্বপ্ন দেখেছিলেন যা হয়ত সফল হয়নি তাঁর জীবিতকালে। কিন্তু এদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায়ে অনেকের উপরই তাঁর গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে বারংবার।
অনেকদিন পরে তাঁর এমনই বক্তব্যের অনুরণন যেন আমরা আরেকবার শুনলাম সেই ইতিহাসপুরুষের দৃপ্তকন্ঠে, যিনি বলেছিলেন- পরাধীনতার যুগে বামপন্থার অর্থ হল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা। এবং “We have learned to distinguish now between false internationalism and true internationalism .We know now that internationalism is true which does not ignore nationalism but is rooted in it”
১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ২৭শেসেপ্টেম্বর রাজদ্রোহের অপরাধে বন্দী অবস্থায় হার্নিয়া অপারেশন করার সময় ধনুষ্টঙ্কার রোগে এই জ্যোতির্ময় দেশপ্রেমিকের মৃত্যু হয় মাত্র ৪৬ বছর বয়সে। মৃত্যুর আগের দিনও তিনি লিখে গেছেন - “ I had never been at any one’s beck and call. I obeyed none. At the fag end of my old age they will send me to jail for law’s sake, and I will work for nothing. Impossible! I won’t go to jail, I have been called.”
তাঁর সর্বস্ব পণকরা অতুলনীয় দৃপ্ত সর্বত্যাগী দেশপ্রেমের বিশ্লেষনে জীবনীকার জুলিয়স লিপনারের অভিমত – Vivekananda lit the sacrificial flame for revolution, Bramhabandhab in fueling it safeguarded and fanned the sacrifice.


