এ এক অদ্ভুত সমাপতন-হয়ত পূর্বস্থিরীকৃত বিধাতার ইচ্ছায়-‘মহাকালে’র অভীপ্সায় ,আশীর্বাদে।
সপ্তদশী কিশোরী একজন পত্রে তাঁর বাবাকে জানাচ্ছেন- আমার উদ্দ্যেশ্য নয় এই পৃথিবীতে লোকের প্রিয় হওয়া । কিন্তু এই পৃথিবীতে খাঁটি হওয়া।খাঁটি হয়েও যদি প্রিয় হতে পারি তবে তো কথাই নেই।
কন্যাকে সুপাত্রে অর্পনের বরিষ্ঠ প্রশাসনিক আধিকারিক পিতার প্রয়াসে ঐ বয়সেই তিনি তীব্র আপত্তি জানিয়ে এবং নিজের জীবনের লক্ষ্যের ইঙ্গিতও দিয়ে তাঁকে বিরত করলেন।
আর সহযোদ্ধা অন্যজন ঢাকার এক পরিবারের জেষ্ঠ্যসন্তান হলেও মাত্র তেরো বছর বয়সেই বৈপ্লবিক কাজে হাতেখড়ি- পরবর্তীতে আবার একাধারে বিপ্লবী দার্শনিক ও তন্ময় সঙ্গীতে-সাধক।
ঐ সপ্তদশী হলেন শ্রীহট্টের আদি বাসিন্দা আসাম সিভিল সার্ভিসের সদস্য আসামের মঙ্গলদই এর তৎকালীন মহকুমা সমাহর্তা শ্রী গিরিশ চন্দ্র নাগের কন্যা লীলা নাগ যিনি পরবর্তীকালে বিপ্লবী দেশনেত্রী শ্রীযুক্তা লীলা রায় নামে অবিভক্ত বাংলা তথা বাংলার বাইরে ভারতীয় রাজনীতিতে সমধিক পরিচিত হন।
গত শতক আরম্ভ পূর্ববছরের আসামের গোয়ালপাড়ায় এক শিক্ষিত উদার সংস্কৃতিমনা পরিবারে এই মহিয়সীর জন্ম। ঘটনাচক্রে ইংরাজী দশম মাসের ওই দ্বিতীয় দিবসে ভারতবর্ষের আরও দুই মহান সন্তানেরও জন্মদিন। সেকারনে দিবসটি ভারতবাসীর কাছে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটি দিন। কিন্তু প্রতিবছর সেদিনটিতে মুলধারার কোন সংবাদপত্রে এই মহিয়সীর নামটিও অধুনা উল্লেখিত হয় না।
অথচ সরকারি প্রচারের গণ্ডির বাইরে ও ক্রমে বিস্মৃতির অতলে চলে যাওয়া এই মহান বিপ্লবী দেশনেত্রী স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধীর অনুগামী না হয়েও তাঁর সাথে এক শ্রদ্ধার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। উভয়ের মধ্যে চিঠি পত্রেও যোগাযোগ ছিল। আবার কবিগুরুর স্নেহধন্যা তিনি জীবনের যাত্রাপথে বারংবার মানসিক শক্তি সঞ্চয় করেছেন সেই মহাদ্রষ্টার আশীর্বানী থেকে।
অভিজাত পরিবারের শিক্ষিতা, মেধাবী,সুদর্শনা এবং আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্না তিনি ইচ্ছে করলেই আর পাঁচজন বাঙ্গালী মহিলার মত সুখে স্বচ্ছন্দে নিরাপদ আরামে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি সব হেলায় সরিয়ে জীবনের কুসুমাস্তীর্ন পথ পরিত্যাগ করে স্বেচ্ছায় দূর্গমের পথযাত্রী হয়েছেন। দেশের জন্য আত্মনিবেদনের উদ্দেশ্যে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।যিনি নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে দ্বিধাহীন ভাবে উচ্চারন করতে পারেন-“আমি আত্মনিবেদিত বিপ্লবী,পেছুটান আমি রাখিনা”।
আসাম সিভিল সার্ভিসের সদস্য বাবা ও শিক্ষিতা গৃহবধূ মা শ্রীমতী কুঞ্জলতা নাগে’র আদরের ‘বুড়ী’ ওরফে লীলাবতী নাগ পরবর্তীকালে রূপান্তরিত হন বিপ্লবী দেশনেত্রী শ্রীযুক্তা লীলা রায়। তাঁর মধ্যে দেশাত্মবোধ এবং বিপ্লবী চেতনার স্ফুরন ঘটেছিল পারিবারিক পরিবেশ এবং সম্ভবত তার শিক্ষা জীবনের প্রারম্ভ থেকেই।ক্ষুদিরামের ফাঁসির দিনে তাঁদের বাড়িতে অরন্ধন পালিত হয়।অবসর গ্রহনের পর ঢাকার বক্সীবাজারের স্থায়ীবাসিন্দা শ্রী নাগ কেন্দ্রীয় আইনসভায় আসামের প্রতিনিধিরূপে নির্বাচিত হলেও লবনকর প্রবর্তনের প্রতিবাদে এক বছরের মধ্যেই পদত্যাগ করেন।
দেওঘরে শিক্ষারম্ভ হলেও কোলকাতার ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে কিছুদিন শিক্ষালাভের পর ১৯১৭ এয় ঢাকার ইডেন স্কুল থেকে বৃত্তি সহ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে লীলা নাগ এলেন কলকাতার বেথুন কলেজে।
বেথুনের সহপাঠিনী শ্রীমতী প্রীতি চট্টোপাধ্যায়ের অনুভবে -“লীলা এলো ঢাকা থেকে ,আমাদের সঙ্গে বেথুন হস্টেলে থেকেই পড়বে। প্রথমটা কিন্তু আমরা তাকে দুরেই রেখে দিলাম, বোধহয় ঢাকার মেয়ে বলে। আমাদের বেথুনের মেয়েদের তুলনায় তাঁকে যেন একটু বেশী পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন,ফিটফাট মনে হল।তখনই দেখেছি তাঁর সমস্ত কাজকর্ম নিয়মে বাঁধা, অত্যন্ত পরিপাটি। সে আবার তাঁর মা বাবার অতি আদরের একমাত্র কন্যা তার উপর সুন্দরী। আমাদের মনে বোধহয় তাই একটু দ্বিধা ছিল , যদি বা সে গর্বিতা হয়,যদি আমাদের সঙ্গে প্রান খুলে না মেশে। কিন্তু সে যে ছিল অত্যন্ত মিশুক তার প্রাণটি স্নেহ ভালবাসায় ভরা, কতদিন আমরা তাকে পর করে রাখব? একদিন সন্ধ্যায় পূবের বারান্দায় একাই একটু পায়চারি করছি, লীলা কাছে এসে গল্প জুড়ে দিল। কত কথাই হল,…আমারও সিলেটই দেশ জেনে তাঁর খুব আনন্দ……. এইভাবে একদিনেই যেন দুজনে চিরদিনের আপনার হয়ে গেলাম এবং ক্রমশঃই আমাদের বন্ধুত্ব নিবিড় হয়ে উঠতে লাগল”।
সহপাঠী ,বন্ধু এবং শিক্ষক -সকলের প্রিয় বিদুষী বহুমুখী প্রতিভার অধিকারিনী তিনি ছিলেন অনেকক্ষেত্রেই প্রথম । কন্ঠসঙ্গীত, যন্ত্র সংগীত।ছবি আঁকা বা খেলাধুলা সব কিছুতেই তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। সেতারের পাঠও তিনি নিয়েছিলেন। নেতৃত্ব দেওয়ার সহজাত ক্ষমতা ও সাহস ছিল। কলেজ জীবনেই বড়লাটের পত্নীকে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানানোর প্রথা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন লীলা নাগ।
বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজীতে অনার্স নিয়ে স্বর্নপদক পেয়ে প্রথম শ্রেনীতে পাস করার পর তখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রচলন না থাকলেও অনমনীয় দৃঢ়চেতনায় বিশেষ অনুমতি আদায় করে ইংরাজী নিয়ে এম এ ক্লাসে ভর্তি হলে পরিচিতি ঘটে সহপাঠী বিপ্লবী অনিল রায়ের সঙ্গে। ১৯২৩ এ দুজনেরই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ- লীলা নাগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম মহিলা হিসাবে ।
লীলা নাগ ইতিমধ্যেই কুমুদিনী বসুর নেতৃত্বে ‘সারা বাংলা নারী ভোটাধিকার সমিতির’ সহ-সম্পাদিকা হন ।১৯২২ এ সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে গঠিত উত্তরবঙ্গ বন্যাত্রান- কমিটির অধীন ঢাকা মহিলা ত্রান কমিটির সহ সম্পাদিকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লীলা নাগের এক ক্লাস উপরের ছাত্র সাহিত্যিক কাজী মোতাহের হোসেন তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি শীর্ষক প্রবন্ধে লীলা নাগের সম্বন্ধে লিখেছেন- “এঁর মত সমাজসেবিকা ও মর্যাদাসম্পন্ন নারী আর দেখি নাই। এঁর থিয়োরি হল, নারীদেরও উপার্জনশীল হতে হবে,নইলে কখন তারা পুরুষের কাছে মর্যাদা পাবেনা”।
এম এ পাস করার পরপরই লীলা নাগ তাঁর বারো জন বন্ধুবান্ধব কে নিয়ে ঢাকায় ‘দীপালি সংঘ’ নামে একটিপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন । ক্রমে ক্রমে দীপালীসঙ্ঘের শাখা গড়ে উঠল ঢাকার পাড়ায় পাড়ায় এবং তাদের পরিচালনায় বারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়,বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র এবং শিল্প শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। ঢাকায় প্রথম বেসরকারি ইংরাজী বিদ্যালয় ‘দীপালি স্কুল’ স্থাপন করেন লীলা নাগ এবং তিনি নিজে এর অবৈতনিক অধ্যক্ষের দায়িত্বভার নেন।পরবর্তী কালে কামরুন্নেসা গার্লস হাইস্কুল নামে তা আজও বিদ্যমান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘নারীশিক্ষা মন্দির’ আজ শেরে-বাংলা-বালিকা মহাবিদ্যালয়।ঢাকার আর্মানিটোলা বালিকা বিদ্যালয়েরও প্রতিষ্ঠাতা তিনি। দীপালি সংঘ যেমন সকল স্তরের নারীদের মধ্যে এক অনাস্বাদিত আনন্দ প্রানচাঞ্চল্য সৃষ্টির সাথে স্বাবলম্বনের আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করল এর নিরলস কর্নধার রূপে লীলা নাগও সারা বাংলাদেশে সুপরিচিত হয়ে উঠলেন।
১৯২৫ সালে দীপালি সংঘের পক্ষ থেকে ঢাকায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে এক বিপুল সম্বর্ধনা দেওয়া হয়।এই অনুষ্ঠানের অভিনবত্ব এবং অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যার বিশালত্ব দেখে কবি বলেছিলেন তাঁর ভাষনে-“ সমস্ত এশিয়াতে মেয়েদের এত বড় সভা দেখিনি কোথাও…”।
ডাক এসেছিল কবির কাছ থেকে শান্তিনিকেতনে মেয়েদের কাজের ভার নিতে। কিন্তু জীবন দেবতা যে তাঁর জন্য ইতিমধ্যেই ভিন্ন পথ নির্দিষ্ট করে ফেলেছেন তবু গেলেন দেখা করতে শান্তিনিকেতন। তারপর? তাঁর নিজের লেখনীতে-‘তাঁর সাথে দেখা হতে প্রনাম করে চুপ করে রইলাম। তাঁর অনুরোধ রক্ষার অক্ষমতা জানাতে সঙ্কোচ হচ্ছিল।কবি বুঝলেন।সস্নেহ প্রসন্নতায় পিঠে হাতখানি রেখে আমার অনুক্ত বক্তব্যকে সহজ করে দিয়ে বললেন “ঢাকার কাজ ছেড়ে বুঝি আসতে ইচ্ছে করছেনা” অন্তর কৃতজ্ঞ হয়ে উঠেছিল ওঁর প্রতি সেদিন’।
এ পথে চলতে চলতে সবার অলক্ষ্যে দীপালি সংঘের মাধ্যমে বিপ্লবের দুর্গম দুঃসাহসিক পথের ডাক পেয়ে সেদিকেই পা বাড়ালেন লীলানাগ।তাঁর গড়া মহিলা ‘আত্মরক্ষাকেন্দ্র’এ অস্ত্রচালনা ও লাঠি খেলা শেখানো হত ।ক্রমে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হলেন একদা সহপাঠী বিপ্লবী অনিল রায়ের সংস্পর্শে এসে।এও যেন বিধাতা নির্দ্ধিষ্ট এক যোগাযোগ। সেইসময় ঢাকায় সক্রিয় বিশেষত শহরের তরুণদের মধ্যে অনিল রায়ের সংগঠন ‘শ্রীসঙ্ঘ’ । ঢাকার মানিকগঞ্জের বায়রা গ্রামে ১৯০১ সালের ২৬শে মে ভুমিষ্ঠ নবাবগঞ্জের অরুন চন্দ্র রায় ও শরৎকুমারী দেবীর জেষ্ঠ্যপুত্র অনিল রায়ের মাত্র তেরো বছর বয়সেই বৈপ্লবিক কাজে হাতেখড়ি । তিনি একদিকে গোপন বিপ্লবীদলের সংগঠক-নেতা আবার সঙ্গীতের তন্ময় সাধকও। পদ্য, গীত রচনায় সহজাত শিল্পী-সাহিত্য-সংস্কৃতির উপাসক ।তাঁর ভাবনায়ই প্রথম এসেছিল মহিলা সংগঠনের রাজনৈতিক দিকটি। তিনি ভেবেছিলেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের স্বতন্ত্র ভুমিকা এবং একটি রাজনৈতিক সংগঠনে সহযোদ্ধা হিসেবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা।তাঁর উদ্যোগেই একগুচ্ছ মহিলাও শ্রীসংঘে যোগদান করেছিলেন সেসময় – লীলা নাগও তাঁদের অন্যতমা।
এদিকে দীপালি সঙ্ঘের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রয়োজন হত শ্রীসঙ্ঘের সাংগঠনিক সাহায্য ও সহযোগিতা । যাত্রাপথের এইভাবে নৈকট্যের মাধ্যমে জাতীয় আন্দোলনের গতিপথ দেশের স্বাধীনতা লাভের পথ রাজনৈতিক আদর্শের প্রস্নও উঠে আসত উভয়ের আলোচনায়। জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে গান্ধীজীর অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনে তাঁর বিশেষ আস্থা ছিলনা।তাঁর পথের নির্দেশ তিনি পেলেন সুভাষচন্দ্রের বক্তব্যে। বিপ্লববাদকে পন্থা হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে হওয়ায় লীলা নাগও যোগ দিলেন বিপ্লবী দল শ্রীসঙ্ঘে। সেটা ১৯২৬ সাল ।
ভূপেন্দ্র কিশোর রক্ষিত রায়ের কথায় –“ বিত্তশালী পিতার একমাত্র বিদুষী কন্যার পদতলে যখন ভবিষয়ত সুখের সংসার গড়াগড়ি যাচ্ছিল তখন তিনি সব ছেড়ে দিয়ে বিপ্লবীনী হবার প্রতিজ্ঞা করলেন। তৎকালে ঢাকা শহরের আঁধার পরিবেশে একটি দীপশিখার মত তিনি সঞ্চারিত হচ্ছিলেন, কিন্তু বিপ্লবী সংস্থার সংস্পর্শে এসে সারা বাংলার গগনে তিনি সঞ্চারিত হতে থাকলেন বিদ্যুৎশিখার ম
১৯২৮ সালে কোলকাতায় নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে সুভাষচন্দ্রের পাশে দাঁড়াতে, বাংলার অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে অনিল রায় শ্রীসঙ্ঘের নেতারূপে এবং লীলা নাগও নারী আন্দোলনের অবিসংবাদী নেত্রীরূপে যোগ দেন। সেখানে নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনে বাংলার নারী আন্দোলনের ইতিহাস উপস্থাপনার দায়িত্ব এসে পড়ে লীলা নাগের উপর। এভাবেই জাতীয় আন্দোলনের আঙ্গিনায় তাঁর প্রবেশ। কলকাতা সম্মেলনের পর ঢাকায় ফিরে চলল একই সঙ্গে নারী আন্দোলন এবং অন্তরালে বিপ্লবপথের প্রস্তুতি।ক্রমে বিপ্লবী গুপ্ত আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হল । সেতারের তার ঝংকৃত করা হস্তাঙ্গুলি বোমা বারুদের স্পর্শেও অচঞ্চল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ।
১৯৩০ সালে অনিল রায় গ্রেপ্তার হলে শ্রীসঙ্ঘের দায়িত্বও এসে পড়ে লীলা নাগের উপর । ইতিমধ্যে কোলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলে তাঁরই পরিকল্পনায় এবং উদ্যোগে এক ছাত্রী আবাসিক স্থাপিত হয়। বিপ্লবী রেনু সেন হলেন এর ভারপ্রাপ্ত। আসলে ছাত্রী আবাসিকের আড়ালে বিপ্লবীদের গোপন একটি ঘাঁটি-অস্ত্র আদানপ্রদানের সুবিধার্থে।
তবে এইবিপ্লবী অগ্নিকন্যার জীবনও কখনও কখনো কঠিন সময়ের পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে-মূল্যবোধের দ্বন্দ্বে –সংশয়ে বিক্ষুব্ধ মন অবশ্য অবশেষে সঠিক দিশায় উত্তীর্ন হয়েছে-দেশের জন্য সর্বস্বসমর্পনে আত্মনিবেদনের প্রতীতি দৃঢ়তর হয়েছে। নিজেই বলেছেন “নিজেকে ভেঙ্গেচুরে ঢেলে সেজেছি,আমার জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এলো’।
১৯৩১ এর এপ্রিলে (বাংলা ১৩৩৮ এর বৈশাখ) ‘ মেয়েদের মধ্যে দেশাত্মবোধ ও শংকাহীন দেশসেবার ভাব জগ্রত করবার’ উদ্দেশ্যে লীলা নাগের উদ্যোগে এবং সম্পাদনায় নারী আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে এক সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক রুচিশীল পত্রিকা ‘জয়শ্রী’ প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকে যা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদধন্য ও নামকরনকৃত। পত্রিকার নামকরন করে যে আশীর্বাণী পাঠালেন কবিগুরু তা এইরকমঃ-
বিজয়িনী নাই তব ভয়,/ দুঃখেও বাধায় তব জয়।
অন্যায়ের অপমান / সম্মান করিবে দান,
জয়শ্রীর এই পরিচয়।।
কিন্তু ঐ বছরেরই ২০ শে ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হলেন লীলা নাগ ও রেনু সেন, দীপালি প্রদর্শনীর কাজ শেষে বাড়ী ফেরার পথে, ১০ই ডিসেম্বর বিপ্লবীদের ঢাকার বড় ডাকঘর লুঠ করার চেষ্টার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে। ১৯৩১ এর ২০শে ডিসেম্বর থেকে ১৯৩৭ এর ৮ই অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘদিন তিনি বন্দীছিলেন ঢাকা,রাজসাহী,সিউড়ি মেদিনীপুর এবং হিজলী জেলে। ইতিহাস বলে, ভারতবর্ষে বিনা বিচারে আটক প্রথম মহিলা রাজবন্দী হলেন লীলা নাগ।
দীর্ঘ কারাবাসের পর লীলা নাগ মুক্তি পেলেন ১৯৩৭এ ;আর অনিল রায় ১৯৩৮ এ।
কারামুক্তির পর তাঁকে আশীর্বাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-“ কারাবাস্ থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে তুমি বেরিয়ে এসেছ শূনে আরাম বোধ করলুম।মানুষের হিংস্র বর্বতার অভিজ্ঞতা তুমি পেয়েছ-আশা করি এর
একটা মূল্য আছে, এতে তোমার কল্যান সাধনাকে আরও বেশি বল দেবে……তুমি আমার সর্বান্তকরনের শুভকামনা গ্রহন করো”।
জেল থেকে বেরিয়েই আবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন কর্মযজ্ঞে। জয়শ্রীও প্রকাশিত হতে লাগল।
একটা কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, জয়শ্রী প্রথমে মেয়েদের পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরবর্তীকালে পুরুষ লেখকদের জন্যও এর দরজা উন্মুক্ত হয়। একটা সময় বাংলার প্রথিতযশা প্রায় সকল কবিসাহিত্যিক বিদগ্বজনদের সৃজন প্রকাশিত হয়েছে ব্যতিক্রমী রুচিশীল এই পত্রিকাটিতে । বিশিষ্ট আদর্শ ও চিন্তাধারার প্রতীক প্রতিষ্ঠাত্রী সম্পাদিকার সতর্ক নজর থাকত পত্রিকার মান বজায় রাখা ছাড়াও এর বিশেষ আদর্শ ও সামাজিক লক্ষ্যের দিক সম্বন্ধে।কেবলমাত্র এর গতানুগতিকতামুক্ত নির্ভীক সম্পাদকীয় প্রতিবেদন নয় পত্রিকাটির সামগ্রিক রূপে সম্পাদিকার নিজস্ব আদর্শ ও ভাবধারার সাথে তাঁর সুগভীর মনন মনীষা, সূক্ষ্ম বিচারবোধ ও পরিশীলিত রুচির সম্যক উজ্জ্বল প্রকাশ একে বিশিষ্টতা দান করেছিল। সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর কথায় –“তাঁর সম্পাদিত ‘জয়শ্রী’পত্রিকায় তাঁর সাহিত্যপ্রীতির স্বাক্ষর আছে’।
কারামুক্তির পর অনিল রায় নেতৃত্বে শ্রীসঙ্ঘ আবার সক্রিয় হল নবোদ্যমে। উভয়ের উদ্যোগে এবং উপস্থিতিতে শাখা-সংগঠনগুলিও পুনঃজাগরিত হল।
১৯৩৮ সাল। সুভাষচন্দ্র কর্তৃক জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি গঠিত হলে সেই কমিটিতে বাংলা থেকে মহিলা সাবকমিটির সভ্য মনোনীত হন লীলা নাগ ।
১৯৩৯এর ১৩ই মে দেশব্রতে উৎসর্গিকৃ্ত এই দুই মহৎ প্রান বন্ধনে আবিষ্ট হলেন। লীলানাগ হলেন লীলা রায়। ১৯৩৯ এর জুন মাসে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করলে অনিল রায় এবং লীলা রায় সেইদলে যোগদান করেন।
আপন আদর্শনিষ্ঠা ,নিরলস পরিশ্রম এবং কর্মদক্ষতায় লীলা রায় সুভাষচন্দ্রের আস্থা নির্ভরতা অর্জন করায় অচিরেই তাঁর উপর দলের অনেক গুরুদায়িত্ব এসে বর্তাল। সেজন্যই সুভাষচন্দ্র গ্রেপ্তার হওয়ায় দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে অনিল রায় লীলা রায়ের উপরএবং দলের ইংরাজী সাপ্তাহিক ফরোয়ার্ড ব্লক’ সম্পাদনার ভার পড়ে লীলা রায়ের উপর।। এই সময় দলের সাংগঠনিক কাজে এঁদের বাংলার বাইরেও বিভিন্ন রাজ্যে প্রায়শ যেতে হয়েছিল বলে জাতীয় পরিসরেও রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে উঠেছিল । আর তখন সুভাষবাদী আদর্শ প্রচারে দুর্জয় নিষ্ঠা ও সাহস অনিল রায়কে বিশিষ্টতা দিয়েছিল।
১৯৪১ সালে গৃহবন্দী সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান এবং বার্লিন থেকে তাঁর বেতার ভাষনে প্রকাশ পেল বৈদেশিক সাহায্যে স্বাধীনতা যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার সম্ভাবনা। ক্ষিপ্ত ব্রিটিশ সরকার ফরোয়ার্ড ব্লক সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে আরম্ভ করল।
১৯৪২ সালের ১৩ই মার্চ ‘Fascist in India’ শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থক ইংরাজী স্টেটসম্যান লিখল-‘ …Nevertheless we all know that Bengal was the home of a small but convinced pro-fascist party led by Mr. Subhas Chandra Bose.
It is the business of the Govt to round up the enemies of the country forthwith and put them to death. No quarter whatever should be given to them…..The penalty for traitors to India must be death,”
এই সম্পাদকীয় দেশের অগনিত সুভাষ-অনুগামীদের মধ্যে এক ত্রাসের সঞ্চার করল। ইতিমধ্যে ১৯৪১ সালের ২১ শে জুন জার্মানি সোভিয়েট রাশিয়া আক্রমন করে বসায় ভারতীয় কম্যুনিষ্টদের কাছে রাতারাতি ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ জনযুদ্ধে’ রূপান্তরিত হল। এর আগে পর্যন্ত তাঁরা বলে আসছিলেন এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে ‘এক পাইও নয় এক ভাইও নয়’ হঠাত সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারকে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাঁদের প্রচন্ড আক্রোশ গিয়ে পড়ল নেতাজী অনুগামীদের উপর। বামপন্থী দাবিদার কম্যুনিষ্ট পার্টির সদস্যরা দেওয়ালে দেওয়ালে নেতাজী অনুগামীদের বিরুদ্ধে পোস্টার সেঁটে দিলেন ‘shoot them”.। আবার শরৎচন্দ্র বসুকে সরকার অন্তরীন করে রেখেছে দক্ষিণ ভারতের কুনুর এ।
এ রকম এক ভয়াবহ পরিস্তিতিতে অনুগামীদের মনে সাহস যোগাতে এগিয়ে এলেন দেশনেত্রী। বলিষ্ঠ উচ্চারনে প্রতিবাদ করেছিলেন বিপ্লবী নায়িকা লীলা রায়। জবাব দি্যেছিলেন বিনিদ্র রজনীতে রচিত শানিত লেখনীতে-We shall not stand it. ১৯৪২ এর ১৯শে মার্চ থেকে পর পর তিনদিনে হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এই প্রবন্ধটি।
.দেশনেত্রীর সেই সময়োপযোগী মূল্যবান রচনার বিশেষ কিছু অংশ “ আজ যে-দুনিয়ায় আমরা বাস করছি সে একটা পাগলা-গারদ।বিশেষ করে ভারতবর্ষে ভারতবাসীরা আজ যে অবস্থায় আছে তা ঈর্ষার যোগ্য নয়। যুদ্ধ যখন বাংলা সীমান্তের দিকে এগিয়ে আসছে ,তার জন্য বিভিন্ন দিকে অদ্ভুত ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। … … সর্বোপরি,আমাদের কম্যুনিষ্ট ও র্যডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক বন্ধুগণও সমস্বরে ‘গণযুদ্ধ’ ও ‘যুক্তফ্রন্ট’ এর চীৎকারে গগন বিদীর্ন করছেন,সেই সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ছুরি মারার উদ্দেশ্যে একটি স্থানীয় কলহকে মতবাদের লড়াইয়ের সাজে সাজিয়েগুছিয়ে হাজির করতে বিরত হচ্ছেন না।আর এই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীরাই এমন একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভের পেছনে আশ্রয় নিচ্ছেন-যার কাজই ছিল ভারতের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার নিয়মিত বিরুদ্ধতা করা। … ভারতীয় রাজনীতিতে এদের একমাত্র ভূমিকা হল সেই পথে চলা-যে পথে চলতেগেলে বাধা স্বল্পতম।এই ‘দেশ প্রেমিকেরা’ই চাইবেন আর সবাইকে কারারুদ্ধ দেখতে,যাতে রাজনীতির ক্ষেত্রটি শুধু তাদের নিজেদের জন্যই পরিষ্কার ও খোলা থাকে। আর এই উদ্দেশ্যেই তাঁরা নিশ্চিত কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু যতদিন ভারত শৃঙ্খলিত রয়েছে ততদিন এযুদ্ধ কখনো তার কাছে জনযুদ্ধ হতে পারে না’
ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হলে ফরয়ার্ডব্লককে নিষিদ্ধ ঘোষণা করাহয়। ‘জয়শ্রী’পত্রিকার অফিসে পুলিশ তালা লাগিয়ে বন্ধ করে এবং অফিসের সমস্ত জিনিসপত্র ক্রোক করে নিয়ে যায় ।
এরপর ১৯৪২ সালের এপ্রিলে অনিল রায় ও লীলা রায় গ্রেপ্তার হন।শোনাযায় আজাদ হিন্দ ফৌজ যখন ইম্ফলের দ্বারপ্রান্তে তখন নেতাজী চেষ্টা করেছিলেন তাঁর এই নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত অনুগামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে কিন্তু দূর্ভাগ্য তাঁরা দুজনেই তখন জেলে বন্দী।
সিমলা কনফারেন্স এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আটক কংগ্রেস নেতা ও কর্মীরা ছাড়া পেলেও লীলা রায় এবং অনিল রায়কে মুক্তি দিতে রাজী হল না সরকার। লীলা রায়কে দিনাজপুর এবং অনিল্ রায়কে দমদম সেন্ট্রাল জেল থেকে পালানোর ডঃ অতীন বসুর গোপন পরিকল্পনাও ভেস্তে যায় । এরপর লীলারায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে কোলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করতে বাধ্য হয় সরকার ।
১৯৪৬ এ জেল থেকে ছাড়া পেয়েই তাঁরা আবার ত্রান ও পুনর্বাসনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।লীলা রায় আবার জয়শ্রী এবং ফরোয়ার্ড ব্লক পত্রিকা প্রকাশ করতে লাগলেন।
সে বছর ১০ই অক্টোবর লক্ষ্মীপূজোর দিন নোয়াখালীর ঘটনার শুরু হলেও সংবাদপত্রে এ খবর প্রকাশিত হয় প্রায় এক সপ্তাহ পরে। খবর পেয়েই ১৪ই অক্টোবর লীলা রায় তাঁর ‘ন্যাশনাল সার্ভিস ইনস্টিস্ট্যুট’এর কয়েকজন কর্মীদের নিয়ে ছুটলেন নোয়াখালীতে।কিন্তু অবস্থা এমনই ছিল যে ৯ই নভেম্বর প্রথম শিবির খুলতে পারা যায় সর্বাপেক্ষা উপদ্রুত রামগঞ্জে। গান্ধীজী নোয়াখালী পৌঁছনোর পূর্বেই লীলারায় উপদ্রুত এলাকায় গিয়ে সাহস করে প্রতিদিন মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে ভীত সন্ত্রস্থ গ্রামগুলিতে ঘরেঘুরে চারশোর বেশি মহিলাকে উদ্ধার করেন।তাঁর কাজের প্রশংসা করে গান্ধীজি তাঁকে ৩১.১২.৪৬ তারিখে এক পত্রে লিখেছিলেন-“ Your note, of course, as was expected of you , you are doing good work. Finish what you have in hand. When you return and we meet ,we shall compare notes. I have read your appeal in the papers. Bapu.” কিন্তু তাঁর নোয়াখালীতে ঐতিহাসিক পদযাত্রায় মহাত্মা গান্ধী লীলা রায় এবং অনিল রায়কে সঙ্গে নিতে যে অনিচ্ছুক তা প্রকাশ পায় অনিল রায়কে ২২/১২/৪৬ তারিখে মহাত্মার নির্দেশে নির্মল কুমার বসুর লিখিত জবাবী পত্রে।
ঐ বছরই ভারতীয় গনপরিষদের সদস্য হিসেবে শ্রীযুক্তা লীলা রায় ঢাকা থেকে নির্বাচিত হন। অবিভক্ত বাংলা থেকে তিনিই একমাত্র মহিলা সদস্য ছিলেন।কিন্তু দেশভাগের প্রতিবাদে কয়েক্ মাসের মধ্যেই পদত্যাগ করেন। ১৯৪৭ এ প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মিলনের বোম্বাই অধিবেশনে মহিলা সাহিত্য শাখার সভানেত্রী পদ অলংকৃত করেছিলেন।
সুভাষচন্দ্রের ভাবাদর্শে অনুপ্রালিত লীলা রায় অনিল রায় দেশবিভাগের বিরোধিতা করছিলেন তীব্রভাবে। সেই সময় অনিল রায় জয়শ্রী পত্রিকায় লিখেছিলেন-“দুই জাতিত্বকে,দুই জাতির মধ্যে ব্যবধান ও পার্থক্যকে যারা বিশ্বাস করতে চান,আঁকড়ে থাকতে চান, তারা থাকুন। এই মতবাদ লীগ প্রচার করেছেন, কংগ্রেস ও প্রকারান্তরে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু নেতারা যাই বলুন বা করুন,ইতিহাসের গতিকে তারা ঠেকাতে পারবেন্ না। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেবার লোক থাকবে না তা বলছিনে।থাকবে চিরকালই।স্বার্থান্বেষীওথাকবে ধর্মান্ধতাকে অপব্যবহার করে দরিদ্রের শোষণ করবারজন্য, বিত্তশালীর ভোগবিলাসের ইমারতকে পোক্ত করবারজন্য। কিন্তু তাতে ইতিহাসের গতি পাল্টাবেনা।মানুষকে মানবিক মর্যাদাদান করে যারা গনতন্ত্রের পথ রচনা করতে চান তাঁরা এগিয়ে যাবেন। তাঁদের কাছে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাধিক্যের প্রশ্ন ধর্মকে নিয়ে নয়, শোষককে নিয়ে,বিত্তবান ও বিত্তহীনকে নিয়ে। নতুন মানবতার দুন্দুভি একদিন বেজে উঠবেই। সেদিন হিন্দুমুসলমান আর সংখ্যালঘু-সংখ্যাগরিষ্টের এই সাম্প্রতিক কোলাহল মিলিয়ে যাবে।সেদিন জনতা এগিয়ে আসবে। তাদের জাতি
থাকবে না,ধর্মবিদ্বেষ থাকবে না ।শুধু থাকবে এই চিরন্তন কথাটা যে তাঁরা মানুষ।আজকের সংখ্যাধিক্য ও সংখ্যালঘু সবাইকে এই কথাটা স্মরন রাখা প্রয়োজন”।
তাঁর এই আশাপূর্ন ভবিষ্যৎ বানী হয়ত বাস্তবে রূপ পায়নি কিতু বিপ্লবী তো স্বপ্ন দেখবেন; স্বপ্ন না দেখলে বিপ্লবের অভিমুখ স্থিরীকৃত হবে কিভাবে।অধিকন্তু তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য হয়ত আজও প্রাসঙ্গিক।
তবু দেশবিভাগ হল।দেশবিভাগের পর তারা ঢাকায় থেকে যাওয়ার মনস্থ করেন । লীলা রায় গঠন করলেন National Women Solidarity Council. কবি সুফিয়া কামাল কোলকাতা থেকে ঢাকায় এলে তাঁকে নানাভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন লীলারায়।
কিক্তু ক্রমে তিনি পাকিস্তান সরকারের চক্ষুশূল হয়ে পড়লেন এবং সন্দেহভাজনের তালিকায় চলে গেলেন।আঘাত এল জয়শ্রীর উপরও। বাধ্য হয়ে কোলকাতায় চলে আসেন প্রিয় শহর প্রিয় দেশ ছেড়ে। উভয়ের কর্মকান্ডের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠল কোলকাতা। লীলা রায় উদ্বাস্তু এবং দুস্থ মহিলাদের পুনর্বাসনের কর্মকান্ডে নিজেকে সঁপে দিলেন। ১৯৫১সালে ভারত সরকারে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বিলের বিরোধিতা করলে আবার কারাবন্দী হন।
কিন্তু তাঁদের তের বছরের বিবাহিত জীবনের,যার মধ্যে প্রায় পাঁচ বছর কারাবাস, আকস্মিক পরিসমাপ্তি হল .১৯৫২ সালে কর্কট রোগে মাত্র একান্ন বছরয়সে অনিল রায়ের মৃত্যু হওয়ায়।
সুভাষবাদের এই একনিষ্ঠ অনুগামী ও ব্যাখ্যাকার মনস্বী কারাবাসে থাকাকালীন রচনা করেছেন-‘সমাজতন্ত্রীর দৃষ্টিতে মার্ক্সবাদ, নেতাজীর জীবনবাদ এবং ‘What Netaji stands for’ ধর্ম ও বিজ্ঞান’ ‘গান্ধীবাদ ও অহিংসা’, বিবাহ ও পরিবারের ক্রমবিকাশ,হেগেল প্রসঙ্গে, ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা প্রমুখ গ্রন্থ ।তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন-নেতাজীর পথই ভারতের সামনে একমাত্র পথ এবং বিপ্লবী বা সমাজবাদী হতে গেলে মার্ক্সবাদী হওয়া অপরিহার্য নয়। দর্শনশাস্ত্রে পণ্ডিত সাহিত্যমনষ্ক তিনি ছিলেন আবার রবীন্দ্রগানের তন্ময় সাধক। যেমন অপূর্ব রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে পারতেন তিনি তেমনই ছিল তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা,
স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী প্রয়াত সাংসদ শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সমর গুহের মতে- এই বিচিত্রকর্মা পুরুষের অকাল প্রয়াণ সমন্বয়- সমৃদ্ধ ভারতীয় সাধনায় অকস্মাৎ ছেদ টেনে দিয়েছে। এ ক্ষতি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয় , সারা ভারতেরই অপূরণীয় ক্ষতি। বিপ্লবী অনিল রায়ের গাওয়া রবীন্দ্রগানের হৃদয় নিংড়ানো আকুলতার সুগভীর আবেশ প্রসঙ্গে বিপ্লবী ভূপেন্দ্র কিশোর রক্ষিত রায় তাঁর ‘সবার অলক্ষ্যে’ গ্রন্থে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন এভাবে-১৯৪৬ সালের দমদম সেন্ট্রাল জেলের এক সন্ধ্যা অবসান। পরের দিন ছুটি হবে। সেল এ গুন গুন করে সুর ভাঁজছিলেন অনিলবাবু। বক্সা ও প্রেসিডেন্সি জেল থেকে আসা বন্ধুদের মধ্যে দু’জন এসে গান করার অনুরোধ করলে । অনিলবাবু খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে গান ধরলেন-
“রোদনভরা এ বসন্ত , সখী কখনো আসেনি আগে…।“
বহুক্ষণ ধরে গেয়ে গেয়ে থেমে গেলেন একসময়ে ।থমথম করছে বাইরের আকাশ ও পৃথিবী। … মনেহল শহিদদের বিরহব্যাথায় পৃথিবীর সমাগত বসন্তদিন সত্যি কান্নায় ভরে গেছে।যে কান্নাকে সারাদিন স্পর্শ করা যায়নি ,সন্ধ্যায় ঐ রমনীয় আঁধারে একজনের কন্ঠে তাকে ছোঁয়া গেল’। (সবার অলক্ষ্যে)
প্রায় ঊনত্রিশ বছরের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা জীবন সাথীর এই অকালপ্রয়ানে স্বাভাবিক সাময়িক শারীরিক ও মানসিক বিপর্যস্ততা অতিক্রম করে এই চিরবিপ্লবী কিন্তু আবার সত্ত্বর ফিরে এলেন কর্মক্ষেত্রে।
১৯৫২এর ডিসেম্বর এ দিল্লীতে অনুষ্ঠিত UNESCO আয়োজিত ’On the Status of women in South East Asia’ সেমিনারে আমন্ত্রিত এবং যোগদান।
১৯৫২-৫৩ সালেই তাঁর উদ্যোগেই ভারতের তিনটি রাজনৈতিক দল-সমাজতন্ত্রী দল ,কৃষক মজদুর দল ও সুভাষবাদী ফরোয়ার্ড ব্লকের মিলনের মধ্য দিয়ে প্রজা-সমাজতন্ত্রী দল গঠিত হয় এবং তিনি নতুন দলের জাতীয় পরিষদের অন্যতম সদস্য হলেন।
কিন্তু এল গুরুতর রোগের আক্রমন এবং তারপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর।
১৯৫৫ সালে প্রথমবার স্ট্রোক হল,যখন তিনি রান্না করছিলেন। ডাক্তারের নিষেধ য্বত্তেও কয়েকদিন পরেই আবার বেরিয়ে পড়লেন সমাজসেবার কাজে নিজের সুখ দুঃখের প্রতি নির্লিপ্ত উদাসীন আত্মপ্রচারবিমুখ এই মানুষটি । এছাড়া সারাক্ষণ ব্যস্ত ৪৭/এ রাসবিহারী এভিন্যুয়ে দলীয় অফিসে। ১৯৬০ সালে প্রজা সমাজতন্ত্রী দলের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার চেয়ারম্যান হন কিন্তু রাজনীতিতে বিরক্ত হয়ে দু’বছরের মধ্যেই পদত্যাগ এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর, প্রায় আটত্রিশ বছর সক্রিয় রাজনীতির উদ্দাম ঢেউ এ উথাল পাথাল জীবনের ভেলায় ভেসে অনেক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজের আদর্শ ও কর্মের লক্ষ্যে দৃঢ় থেকে।
প্রধানত ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে তাঁর কর্মকাণ্ডের সূচনা ও আবর্তিত হলেও সমগ্র দেশের কথাই তাঁর ভাবনায় যে ছিল তা পরিস্ফুট হয় জয়শ্রী’র সম্পাসকীয় স্তম্ভে ও অন্যত্র তাঁর বিবিধ রচনায় এবং তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার প্রেক্ষিত থেকে।পণ্ডিত নেহরুর এবং কংগ্রেসের নীতির কঠিন সমালোচক যে তিনি ছিলেন জয়শ্রী পত্রিকায় তাঁর বিভিন্ন রচনায় তা স্পষ্ট ।অতএব মূল্য তো দিতেই হবে। একথা অনুমান করা যায় যে যদি তিনি নীতির প্রশ্নে একটু আপোষ করতেন, তৎকালীন ক্ষমতাধরদের কাছে একটু মাথা নত করতেন তবে হয়ত তিনি রাষ্ট্রিয় ক্ষমতার অলিন্দের কাছে পৌঁছতে পারতেন; রাজনৈতিক প্রাপ্তিযোগও অলভ্য ছিলনা কিন্তু তাঁর আদর্শনিষ্ঠা শুভ্র আত্মসম্মান বোধ ,পারিবারিক সুত্রে প্রাপ্ত নির্লভ দেশাত্মবোধ আত্মোৎসর্গের প্রেরনা তাঁকে সঠিক দিশা দিয়েছে। অন্যায়কে মেনে নেওয়া বা এর সাথে মানিয়ে নেওয়া তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ ছিল। স্বাধীন ভারতেও তাঁকে কারাবরন করতে হয়েছে একাধিক বার পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য।
আসলে স্বাধীনোত্তর দেশে একটি পরিবারের হাতে ক্ষমতার চাবিকাঠি চলে যাওয়ায় প্রথম থেকেই সরকারি প্রচার যন্ত্রের সাহায্যে সেই পরিবারের মাহাত্ম্য কীর্তনে ক্রমে সুভাষচন্দ্রকে প্রান্তিকতায় নির্বাসিত করার ব্যর্থ অপচেষ্টার পাশাপাশি সকল সুভাষ অনুগামীকেও অবহেলা কিংবা প্রলোভনে বশ করার চেষ্টা চলতে থাকে।যিনি তারা জেনকিনস এর কাছে স্বীকার করেছিলেন যে ‘It is true, I did let subhash down ,তাঁর উত্তরসুরীদের আমলে বা উদ্যোগে সেই অপপ্রচার জোরদার হবে সেতো স্বাভাবিক ।সুবর্ণ সুযোগ এসে গেল এই অপকর্মে বসু বাড়ির একাংশকে সাথে এবং হাতিয়ার হিসেবে অনুগত খোসলা কমিশনের রিপোর্টটি জরুরি অবস্থা জারির কাছাকাছি সময়ে পেয়ে যাওয়ায়, এবং বাড়তি সুবিধা পাওয়া গেল ১৯৮৫ র পর থেকে ।মদত যোগাতে থাকে বাংলা সংবাদপত্রের এক বড় হাউস , না হলে ১৯৭০ এ দেশনেত্রীর প্রয়াণের পর প্রথম শ্রেণীর ্যে বাংলা দৈনিকের সম্পাদকীয় স্তম্ভে লেখা হয়েছিল- দেশনেত্রী লীলা রায়ের লোকান্তরে বাংলা তথা ভারতের রাজনীতিক্ ক্ষেত্র হইতে একজন অসামান্যা মহিলার তিরোধান হইল। …কিন্তু দেশবাসীর স্মৃতিতে তাহাঁর ভাবমূর্তি অমর হইয়া রহিয়াছে এবং দেশপ্রেম,মানবপ্রীতি যতদিন সদগুন বলিয়া বিবেচিত হইবে ততদিন দেশবাসী তাহাঁকে ভুলিতে পারিবে না’, সেই সংবাদপত্রগোষ্ঠীরই কোন সংবাদপত্রেই ইদানীং বহুবছর ২রা অক্টোবর কিংবা ১১ই জুন সেই অসামান্যার জন্ম বা প্রয়াণ দিবসের উল্লেখটুকুও থাকেনা, কিন্তু গুরুত্ব সহকারে মাঝে মধ্যেই প্রকাশিত হয় সেই ইতিহাসপুরুষের ‘উত্তরাধিকারী’ ছলে কতিপয় মতলবীর রেঙ্কোজী মন্দিরের ‘চিতাভস্ম’ দেশে আনার অসৎ দাবির কথা এবং বিমান দূর্ঘটনায় মৃত্যুর উদ্দেশ্যমূলক কল্পকাহিনী। বিমান দূর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যুর ‘কাহিনী’ বিশ্বাস করতে নারাজ সুভাষবাদে তন্নিষ্ঠ দেশনেত্রীর কথা আজ আর তাই স্থান পায় এসব দৈনিকে।
বর্তমান রাজনীতির আবহে অগ্নিকন্যা বিপ্লবী লীলারায়ের আদর্শবাদিতা ,অতুলনীয় নির্লোভ আত্মত্যাগ হয়ত রূপকথা সদৃশ মনে হলেও সত্য এই যে দেশের স্বাধীনতারজন্য উৎসর্গিত সমকালীন আরও অনেক মহাপ্রানের মধ্যে নিঃসন্দেহে সেই মহিয়সীর অনন্যসাধারণ ব্যতিক্রমী এবং অননুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।
সাহিত্যিক বানী রায়ের লেখনী বলে-“রাজনীতি,সমাজসেবা ও সাহিত্য –ত্রিধারায় লীলারায়ের ব্যক্তিত্ব বহমান। ।রাজনীতি ক্ষেত্রে তাঁর অতুলনীয় অবদান , তাঁর খ্যাতি তাঁকে করে তুলেছিল রূপকথার রাজকন্যা। তীক্ষ্ণধী, অপরিসীম বুদ্ধি,আদর্শ কর্মক্ষমতা লীলা রায়ের প্রতিটি কর্মে ।… ঘরোয়া রান্না থেকে বোমাবারুদে অপরিসীম দক্ষতা যার ,সেই লীলারায়কে জানবার,দেখবার ইচ্ছাছিল । ওঁর দলের একটি মেয়ে বলেছিলেনঃ অনিল রায় ও লীলা রায়-এরা স্নেহপ্রবন। দু’জনে যখন গল্প করেন আমাদের সঙ্গে ,মনেও হয় না এককালে কী মারাত্মক কার্যকলাপে এঁরা লিপ্ত ছিলেন। লীলা রায় যখন আমার মাথার চুলের মধ্যে হাত রাখেন , বোঝাও যায় না এই নরম আঙ্গুলগুলো পিস্তলের স্বাদ পেয়েছে”।
দেশনেত্রী লীলারায়ের ব্যক্তিত্বে একই সঙ্গে জননীর স্নেহপরায়নতা কিন্ত আদর্শের প্রতি আপোষহীন অবিচল আস্থা আর অন্যায়ের প্রতিরোধের কর্তব্যবোধের কাঠিন্য।তাঁর সুশীতল স্নেহচ্ছায়ায় দুর্গত পেয়েছে নিরাপত্তা ও আশ্রয় , আবার তাঁর সংস্পর্শ অনুপ্রাণিত করেছে জ্বলন্ত দেশপ্রেমে উদ্দীপ্ত হতে। এ যেন স্নেহবলে তিনি মাতা/বাহুবলে তিনি ত্রাতা। নিজের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে এই ব্যক্তিত্বময়ী একদা লিখেছেন-“ আমি দশজন লোকের মত চলি না।…। জীবনে অতি অল্প বয়স থেকেই কতকগুলো নীতিকে স্বীকার করে নিয়ে নিজের জীবনে সেগুলো আচরণ করবার চেষ্টা করে থাকি। তা বিভিন্ন লোকের দৃষ্টিতে ভাল বা খারাপ হতে পারে তাতে আমার এসে যায় না।নিজের নীতিতে অবিচলিত থাকার মত দৃঢ়তা আমার আছে এবং সে দৃঢ়তা শেষ দিন পর্যন্ত থাকবে ”।
১৯৬১ থেকে নাকতলাবাসী হলেন দেশনেত্রী । সঙ্গে ১৯৫২ থেকে বারো বছর বয়সী সঙ্গী ভ্রাতুস্পুত্র বিজয় নাগ। তাঁর কথায় “আমি ষোল বছর ঐ বিশাল ,ব্যস্ত মনকে নানা ঘটনার ঢেউয়ে দেখেছি। কখনও ঢেউয়ের সাথী হয়েছি কখনও তীরে বসে অনুভব করার চেষ্টা করেছি।বাঙ্গালী নির্যাতনের দিনগুলিতে তাঁর ক্লান্তিহীন চাঞ্চল্য…সেই সব অত্যাচারিত,অপমানিত,ভাগ্যহতদের জন্য কি অসীমযন্ত্রনা,কত অনিদ্র রজনী প্রভাত হয়েছে, পথ খুজেছেন এই অন্যায় অনাচার থকে দেশকে মুক্ত করতে ” তাঁর পর্যবেক্ষনে “ পিসির রাজনৈতিক কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও সাংসারিক জীবনের কোন কাজেই ত্রুটি ছিলনা।তিনি জীবনের সামগ্রিক বিকাশে বিশ্বাস করতেন এবং নিজেকেও সেই সামগ্রিক পরিপূর্নতায় গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর যেন কোন দিকেই অসম্পূর্নতা নেই। প্রতিটি কাজে কী নিষ্ঠা ,কী দরদ!…রাঁধতে তিনি ভালবাসতেন। তাঁর রান্না কোন সময়ই গতানুগতিক নয়। …অর্থের আতিশয্যহীন সূক্ষ সৌন্দর্যবোধ প্রকাশিত হত তাঁর প্রতিটি কাজে” । দলীয় রাজনীতি ছাড়লেও দূর্গত মানুষের পাশে সবসময় ছিলেন লীলা রায়। ১৯৬৪ সালে পূর্ব বাংলা বাস্তুহারা বাঁচাও কমিটির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে আবার গ্রেফতার। আবার বন্দী জীবন। এর ফলে শরীর ক্রমশ ভেঙ্গে পড়ছিল ১৯৬৭ সালে পা ভেঙ্গে হলেন শয্যাশায়ী।সে বছরই হল আরেকবার স্ট্রোক । নেতাজীর ঘনিষ্ট সহযোগীদের অন্যতম তিনি তাইহোকুতে তথাকথিত বিমান দূর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু ‘কাহিনী’ বিশ্বাস করতেন না এবং তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এলাহবাদের কাছে ফৈজাবাদের গুমনামী বাবা’ই (ভগবানজী) নেতাজী যার সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। নেতাজির আর এক বিশ্বস্ত সহযোগী পবিত্র মোহন রায়ের কাছ থেকে ১৯৬৩র জানুয়ারির এক প্রাক অপরাহ্নে গুমনামীবাবাই যে নেতাজি এবং তাঁর অবস্থান জানার পর তাঁর মনের অনুভূতি তিনি ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করেছেন এভাবেঃ
৭/১/৬৩ – আজ দুপুরে এক অত্যাশ্চর্য সত্য উদঘাটিত হোলো। অভাবনীয় তার সম্ভাবনা,অচিন্ত্যনীয় ওর আনুসঙ্গিক সবকিছুই। আমার অনুভূতিকে বিশ্লেষন করতে বা ভাষা দিতে চেষ্টা করবো না।কেবল বলবো – হে অঘটনপটিয়সী দেবতা আবার দেখলাম অকস্মাৎ কোথায় কি ঘটে-চির অসম্ভব আসে চির সম্ভবের বেশে। যাদের বল্লাম তাদের নানা বিচিত্র প্রতিক্রিয়া।
এরপর তিনি ও সমর গুহ বিশ্বস্ত কয়েকজনকে নিয়ে পবিত্রমোহন রায়ের সাথে যান নৈমিষারণ্যে গুমনামীবাবাকে দর্শন করতে। তারপরেও তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল পত্র বা বিশ্বস্ত লোক মারফৎ যা পরবর্তীকালে জানা গেছে। ১৯৬৩ সাল থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি প্রতিমাসে নিয়ম করে ভগবানজীর কাছে অর্থ এবং জিনিসপত্র পাঠাতেন। প্রতিবছর ২৩শে জানুয়ারি নেতাজির ঘনিষ্ঠ অনুগামী বিশেষ কয়েকজন অবশ্যই যেতেন সেখানে। ১৯৬৩ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর তিনি দিলীপ কুমার রায়কে একটি পত্র লিখেছিলেন ভগবানজীর নির্দেশ- I wanted to tell you something about your friend. He is alive; in India. ১৯৬৩ জানুয়ারী থেকে ১৯৬৮ ‘র জানুয়ারীর মধ্যবর্তী সময়ে জয়শ্রী পত্রিকায় তাঁর সম্পাদকীয় প্রতিবেদনগুলিতেও একযেন অস্ফুট ইঙ্গিত ছিল কোন আগমনের পদধ্বনির। তাঁর এই দৃঢ় প্রতীতির ভিত্তি যে কি তা অবশ্য প্রকাশ্যে আসেনি তবে এই অগ্নিময়ীর মৃত্যু ভগবানজী’র কাছেও ছিল এক বিরাট আঘাত।
১৯৬৮ এর ৪ঠা ফেব্রুয়ারী হঠাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এর ফলে সদা কর্ম তৎপর সাহসিকা বাগ্মী অকস্মাৎ বা্কশক্তিহীন হয়ে গেলেন,চলাফেরার ক্ষমতাও রইল না।১৯৬৮ এর ২৩শে জানুয়ারী তার লেখা শেষ সম্পাদকীয়।
আগষ্ট মাসে আবার আক্রমনে সংজ্ঞাহীন হয়ে গেলেন। তারপর শেষ প্রায় দু’বছর এভাবেই ঠাঁই এস এস কে এম হাসপাতালে। অবশেষে এল ১৯৭০ এর ১১ই জুন-মহাপ্রয়াণের ক্ষণটি। সুভাষবাদে অবিচল আস্থাশীল এই অনির্বান দীপশিখা, উপমহাদেশের নারীজাগরণের পথিকৃৎ ও আমৃত্যু এক নিরলস অনন্যা যোদ্ধা চির প্রনম্য বিপ্লবী দেশনেত্রীর জীবন দীপ নির্বাপিত হল । সব পিছুটান ছিন্ন করে চলে গেলেন, আত্মনিবেদিত সেই বিপ্লবী । দেশমাতৃকার চরনে নিবেদিতপ্রাণ এক মহাজীবনের অনন্তের পথে যাত্রা মহাকালের রথে, অগনিত স্নেহধন্য প্রিয়জনকে চোখের জলে ভাসিয়ে।
তাঁর মৃত্যুতে অবসান হয়ত হল এক যুগের। এক মহীরুহেরও যেন পতন ;সেজন্য এই মহীয়সীর ব্যতিক্রমী জীবনকাহিনী ও কর্মকান্ডে গভীর আপ্লুত মন্ত্রমুগ্ধ অনেকজনের সেদিন মাতৃসম-স্বজনের বিয়োগে শোকের যন্ত্রনার,দুঃসহ বেদনার অশ্রুবাষ্পের সাথে সাথে মনে উঁকি দিয়েছিল সেই মহাবিপ্লবীর
ভাবাদর্শগত সার্থক উত্তরসূরি হিসেবে তিনি তাঁর বিস্তৃত পক্ষপুটে আশ্রয় দিয়েছিলেন যে সম রাজনৈতিক মনষ্কদের এবং দলমত নির্বিশেষে অসংখ্য দুর্গত দুস্থ সাধারন মানুষের ( বিশেষত মহিলাদের) তাদের ফলত অভিভাবকহীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কাও।
সাহিত্যিক তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন -“শ্রীযুক্তা রায়ের জীবন যদি পার্থিব সুখ,পার্থিব লাভ প্রভৃতির দ্বারা প্রভাবিত হত তাহলে বহুজনেরমত তিনি একটি সহজ ,পরিতৃপ্ত জীবনকে অনায়াসেই পেতে পারতেন। কিন্তু যে দুর্গমের আহ্বানের দ্বারা তাঁর সমগ্র জীবন ও কর্মপ্রয়াস চিহ্নিত ও মহিমান্বিত সেই দূর্গমের আহ্বানই তার জীবনকে প্রথম থেকেই ভিন্নতর মূর্তিতে রূপ দিয়েছে”।
সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিচারনে-‘ তাঁর অসামান্য উদারতা ও পরোপকারবৃত্তির পরিচয় যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে পেয়েছেন,তাঁদের মধ্যে আমিও একজন।… তাঁর যথার্থ স্থান সেই পঙক্তিতে ,যেখানে আছেন আমাদের সমকালীন ও অগ্রজ সেইসব মানুষ ,যাঁরা নিজের কথা না-ভেবে আদর্শের কাছে আত্মদান করেছেন,চেয়েছেন সুখের বদলে জীবনের এক মহত্তর সার্থকতা’।
প্রসঙ্গত যে শহরকে কেন্দ্র করে উপমহাদেশে নারীজাগরনের এই পথিকৃৎ এর কর্মকাণ্ডের সূচনা সেই ঢাকা শহর সেই দেশও অবশ্য এই মহিয়সী নারীকে ভোলেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা ছাত্রীর কথা শ্রদ্ধায় স্মরিত হত কিছুকাল আগেও শিক্ষার সেই মহা অঙ্গনে । বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কক্ষের নামকরণ হয়েছে লীলা নাগ কক্ষ। তাঁর স্মৃতিরক্ষার প্রয়াসে ১৯২৩ নির্মিত ‘লীলা নাগঃ দ্য রেবেল’ এক ঘন্টার তথ্যচিত্রটি সে বছরের নভেম্বরে বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতিতে প্রথম প্রদর্শনী হয় যেখানে তাঁর স্মরণে এক আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ইতিহাসের অধ্যাপক ডঃ মুনতাসীর মামুন বলেন- লীলা নাগের জীবনের একটী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ফরোয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। সেই ঘটনা এই তথ্যচিত্রে স্থান পাওয়া প্রয়োজন ছিল। একটি তথ্যে জানা যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের সময়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ ক্লাসের এই প্রথম ছাত্রীটির কথা সশ্রদ্ধে স্মরণ করা হয়।১৯২৩ এর মার্চে উপাচার্য দ্বারা নাম ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের একটি পরীক্ষা হলের নামকরণ হয় ‘লীলা নাগ পরীক্ষার হল’ ।যে অনুষ্ঠানেও নারী শিক্ষা ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক রূপান্তরের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলানাগের দীপালী সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করে সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করে এক অনন্য ভুমিকা পালনের কথা স্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখিত হয়।
তবে অতীব দুঃখের ও দুর্ভাগ্যের যে শিক্ষা সংস্কৃতির পীঠস্থান এবং তাঁর ছাত্রজীবনের ও কর্মজীবনের দুই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যাপিত হয়েছে মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল যে মহানগরে সেই কোলকাতায় তিনি এখন বিস্মৃতপ্রায়।অথচ এমন এক মহতী জীবনের স্মরনে চর্চায় প্রানিত হলে আধুনিক প্রজন্ম এবং এদেশের বর্তমান নারীবাদীরা, এক অত্যাশ্চার্য ঐতিহ্যের উজ্জ্বল উদ্ধার হয়ত সম্ভব।তেমনই দা্র্শনিক বিপ্লবী অনিল রায়ের অগাধ পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর বহন করছে তাঁর গ্রন্থগুলি যে অবশ্য পাঠ্য হতে পারে আজকের প্রজন্মের। কিন্তু দুঃখের এই যে এই আত্মনিবেদিত অগ্নি সন্তানদ্বয়ের জন্ম ও প্রয়াণ দিবস নীরবে নিভৃতে চলে যায় আত্মবিস্মৃত বর্তমান বাঙ্গালিয়ানার নাগরিক পরিসরের উদাসীনতায় । হায়, ‘তোমার কথা আর কেহ বলে না’ ।
ঋনঃ
- এ আমরা সইব না – লীলা রায়
- স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী –কমলা দাশগুপ্ত
- ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব –ভুপেন্দ্র কিশোর রক্সিত রায়
- সবার অলক্ষ্যে – ভূপেন্দ্র কিশোর রক্ষিত রায়
- জয়শ্রী- লীলা রায় জন্মবার্ষিকী সংখ্যা (শারদীয়া) এবং অন্যান্য সংখ্যা।
- শিখাময়ী লীলা রায়ঃ আগমনী লাহিড়ী ও বিজয় নাগ
- ঐ মহামানব আসে – চারনিক
- স্মৃতিকথা –কাজী মোতাহার হোসেন এবং
- অনুজ ধরের গ্রন্থঃ‘ইন্ডিয়া’স বিগেস্ট কভার আপ’


