খোসলা কমিশনের রিপোর্ট

(“জয়শ্রী – নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু জন্মশতবার্ষিকী গ্রন্থ” – থেকে। যেহেতু “তাঁর” অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে অনেক কথা আজও হয়, সেই সময়ের কিছু উদ্ধৃতি, তথ্য, যুক্তি আজও এতো প্রাসঙ্গিক – এ বিষয়ে নতুন প্রজন্মের জ্ঞাতার্থে এ লেখাটি এই সংখ্যায় পুনঃপ্রকাশিত হল)

১৯৪৫ সনের ১৮ অগস্ট তারিখে বিমানপোতের দুর্ঘটনায় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের অপমৃত্যু সম্বন্ধে যে সংবাদ প্রচলিত আছে তাহার সত্যাসত্য নির্ণয়ের জন্য ভারত সরকার ১৯৫৬ সনের এপ্রিল মাসে শাহনওয়াজ খানের নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান সমিতি গঠন করেন। সুভাষচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছাড়া এই সমিতির অন্য সকল সদস্যই মত প্রকাশ করেন যে ফরমোসা দ্বীপের তাইহোকু শহরের নিকট বিমান-বন্দরে অগ্নিদগ্ধ হইয়া নেতাজীর মৃত্যু হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত অনেকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন নাই এবং পুনরায় এ-বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য অনেক আন্দোলন হয়। ইহার ফলে ভারত সরকার পুনরায় এ সম্বন্ধে তদন্তের জন্য পঞ্জাব প্রদেশের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জি ডি. খোসলাকে নিযুক্ত করেন (১১ জুলাই ১৯৭০)। প্রায় চারি বৎসর পরে তাহার রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে (৩০ জুন ১৯৭৪)। এই রিপোর্ট সম্বন্ধে অনেকেই বিরূপ মত প্রকাশ করিয়াছেন। ভবিষ্যতে এই রিপোর্টের প্রকৃত মূল্যায়নের সাহায্য করিবার জন্য এ-বিষয়ে কয়েকটি মন্তব্য করাই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। আমার মতে এই রিপোর্টটি প্রকৃত সত্যানুসন্ধানী নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত বলিয়া গ্রহণ করা কঠিন। ইহার কয়েকটি কারণ সংক্ষেপে উল্লেখ করিব-সমগ্র রিপোর্টটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করা আমার উদ্দেশ্য নহে।

১। মন্ত্রী উমাশঙ্কর দীক্ষিত লোকসভায় বলিয়াছিলেন যে রিপোর্টটি ৪৬৭ পৃষ্ঠা – কিন্তু এখন যে রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে তাহা ১৩৭ পৃষ্ঠা। সুতরাং রিপোর্টটি যেভাবে প্রথম লিখিত হইয়াছে – পরে তাহার অনেক পরিবর্তন করা হইয়াছে। কবে, কী কারণে, খোসলাজী এই গুরুতর পরিবর্তন করেন তাহা বলা হয় নাই। কেহ কেহ প্রকাশ্যে এইরূপ সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন যে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে অথবা আদেশে এইরূপ পরিবর্তন করা হইয়াছে। এই গুরুতর অভিযোগ সম্বন্ধে সরকারের নীরবতা পূর্বোক্ত সন্দেহের সমর্থন করে।

২। তদন্তের বিষয় সম্বন্ধে ভারত সরকারের স্পষ্ট নির্দেশ এই যে “১৯৪৫ সনে নেতাজী সুভাষচন্দ্রের নিরুদ্দেশ এবং তাহার পরবর্তী ঘটনা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা” (The committee shall inquire into all the facts and circumstances relating to the disappearance of Netaji Subhas Chandra Bose in 1945 and the subsequent developments connected therewith)। অথচ রিপোর্টের ৩৭ পৃষ্ঠায় নেতাজী সম্বন্ধে খোসলাজী যে-সব অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করিয়াছেন তাহার সহিত সুভাষচন্দ্রের নিরুদ্দেশ হওয়ার কোনো সম্বন্ধ নাই। তিনি লিখিয়াছেন যে আগাগোড়াই সুভাষচন্দ্র জাপানিদের হাতের পুতুল এবং তাহাদের উদ্দেশ্যসিদ্ধির যন্ত্রস্বরূপ ছিলেন এবং যখন জাপানীরা যুদ্ধে হারিয়া গেল তখন নেতাজীকে তাহারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই করিত। জাপানিরা ভারতবাসীর সম্বন্ধে বলিত – জাপানিদের হাতের পুতুল বলিয়াও তাহাদের গর্ব বোধ করা উচিত। (“From the beginning they had wanted him as their tool, a pawn in their hands who could be made to move in compliance with their plans and wishes… They… had even twitted the Indians saying “Puppets what is the harm in being puppets? You should be proud to be puppets of the Japanese.”) জাপানিদের সহিত নেতাজীর কী সম্বন্ধ ছিল ইংরেজি ভাষায় লেখা বহু গ্রন্থ পাঠ করিয়া আমি তাহার যে বিবরণ দিয়াছি (History of Freedom Movement, Vol. III, pp. 717 ff) তাহা খোসলা রিপোর্টের উক্তির সম্পূর্ণ বিপরীত। শ্রীযুক্ত খোসলা জাপানি ভাষায় কোনো বইতে তাঁহার সিদ্ধান্তের অনুকূল কিছু পাইয়াছেন কি না জানি না। কিন্তু নেতাজীর ন্যায় ব্যক্তির সম্বন্ধে এরূপ কোনো সিদ্ধান্তের সমর্থক উপযুক্ত প্রমাণ উদ্ধৃত না করিয়া মতামত প্রকাশ করা একজন বিচারক তো দূরের কথা একজন সাধারণ শিক্ষিত লোকের পক্ষেও অসংগত। নেতাজীর সম্বন্ধে ইংরেজ লেখকেরাও এরূপ কোনো মন্তব্য করিয়াছেন বলিয়া আমার জানা নাই। তদন্তের বিষয়ের বহির্ভূত ব্যাপার উপলক্ষ করিয়া এরূপ উক্তি আরো বেশি নিন্দনীয়।

৩। রিপোর্টের কয়েকটি বিশেষত্ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

(ক) যাহাদের সাক্ষ্য বিমান-দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যুর অনুকূল তাহা নির্বিচারে নির্ভরযোগ্য রূপে গ্রহণ এবং যাহার সাক্ষ্য ইহার প্রতিকূল তাহা নির্বিচারে অবিশ্বাস্য বলিয়া প্রত্যাখ্যান। ভারত সরকারের পুলিশ বিভাগের তিনজন কর্মচারী নেতাজীর মৃত্যু সংবাদ সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশেষভাবে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তন্মধ্যে দুই জনের সাক্ষ্য তিনি বিনা বিচারে গ্রহণ করিয়াছেন (পৃ. ৬০-৬১) কিন্তু বি. সি. চক্রবর্তী এ-বিষয়ে যে রিপোর্ট লিখিয়াছিলেন তাহা হারাইয়া গেলেও তাঁহার মৌখিক সাক্ষ্য সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করিয়াছেন (পৃ. ৬১-৬৪)। কারণ সেই রিপোর্ট নাকি খুঁজিয়া পাওয়া গিয়াছে এবং তাহা উক্ত মৌখিক সাক্ষ্যের বিপরীত। অথচ চক্রবর্তী বলিয়াছেন যে রিপোর্টটি ৭৫ পৃষ্ঠা কিন্তু যে রিপোর্টটি দাখিল করা হইয়াছে তাহা ২৫ পৃষ্ঠা। হারানো রিপোর্টটি খোসলা সাহেবের মতের প্রতিকূল- সুতরাং বহুকাল যাবৎ তাহার সন্ধান না পাওয়া গেলেও হঠাৎ তাহা আবিষ্কৃত হইল এবং ৭৫ পৃষ্ঠার জায়গায় ইহা মাত্র ২৫ পৃষ্ঠা হইলেও খোসলা সাহেব তাহার জোরে চক্রবর্তীর সাক্ষ্য নাকচ করিয়া তাঁহার লিখিত এই রিপোর্ট অনুসারে তাঁহাকে মিথ্যাবাদী বলিতে কুণ্ঠিত হন নাই। মনুষ্যচরিত্র সম্বন্ধে যাহাদের বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা আছে তাহারা জানে যে কর্তৃপক্ষকে খুশি করিবার জন্য অধস্তন কর্মচারী মিথ্যা বলে ইহার বহু দৃষ্টান্ত আছে- কিন্তু কর্তৃপক্ষের অভিপ্রেত সত্য কথা না বলিয়া বিরাগভাজনের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা জানিয়াও যে সত্য না বলিয়া মিথ্যা বলে ইহার দৃষ্টান্ত বিরল। ৭৫ পৃষ্ঠার রিপোর্ট মাত্র ২৫ পৃষ্ঠায় কিরূপে পরিণত হইল তাহার ব্যাখ্যাকল্পে বলিয়াছেন যে হয়তো ছোটো অক্ষরে ছোটো কাগজের লেখার ফলে ইহা হইয়াছে। সামঞ্জস্য করার এই অদ্ভুত প্রচেষ্টা হাস্যকর।

(খ) যে-সকল সাক্ষ্য আপাতদৃষ্টিতেই আপত্তিজনক ও অগ্রাহ্য করা যাইতে পারে তাহার সম্বন্ধে অনেক স্থলে তিনি সুদীর্ঘ আলোচনা করিয়াছেন কিন্তু সত্য নির্ণয়ের পক্ষে বিশেষভাবে সহায়ক সাক্ষীর উক্তির উল্লেখ মাত্রও করেন নাই। আমরা নিজের সাক্ষ্য হইতে ইহার দৃষ্টান্ত দিতেছি।

আমি কমিশনে সাক্ষ্য দিয়াছিলাম। সরকারি তদন্তপক্ষের উকিল আমাকে বলিলেন, “আপনি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক হিসাবে আপনার মত কী?” আমি বলিলাম, “যে বিমান-দুর্ঘটনায় টাইহোকুতে ১৮ অগস্ট নেতাজীর মৃত্যু হইয়াছিল ইহা আমি বিশ্বাস করি না।” প্রশ্ন হইল “তিনি তাহা হইলে এখনও জীবিত আছেন?” আমি উত্তর দিলাম যে “নেতাজী এখনও বাঁচিয়া আছেন কি না সে সম্বন্ধে আমি নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ পাই নাই।” উকিল আমাকে প্রশ্ন করিলেন- “নেতাজী যে ১৮ অগস্ট বিমান-দুর্ঘটনায় মরেন নাই তাহার কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে?” আমি বলিলাম, “আছে” এবং তাহার পর নানা প্রশ্নের (অর্থাৎ সওয়াল জবাবের) উত্তরে যাহা বলিয়াছিলাম তাহার সারমর্ম এই।

করি। প্রধানত নিম্নলিখিত তিনটি কারণে টাইহোকু বিমান-দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু সম্বন্ধে আমি সন্দেহ প্রকাশ করি।

১। নেতাজী ১৯৪৫ সনের ১৯ ডিসেম্বর বেতার বাণীতে যে ভাষণ দেন – ভারতে অনেকে তাহা শুনিয়াছে। ১৯৫৫ সালের ২৩ জানুয়ারি ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’য় কলিকাতা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ শ্রীচিন্তামণি কর একটি প্রবন্ধে এই বেতার বাণী আংশিকভাবে উদ্ধৃত করেন। ঐ বেতার বার্তা কলিকাতার লাট ভবনের রেডিও মনিটর শ্রীযুক্ত পি. সি. কর নিজে শুনিয়া প্রচার করেন। ১৯৫৬-৫৭ সালে একটি প্রবন্ধে তিনি ইহার উল্লেখ করিয়াছেন।

১৯৪৬ সনের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে নেতাজী বেতার যন্ত্রের মারফত আরো দুইটি বাণী প্রেরণ করেন।
ইহার একটিতে ক্যাবিনেট মিশন ও পেথিক লরেন্সের উল্লেখ আছে। ইহা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এইসব বেতার বাণী যে নেতাজীর গলায় উচ্চারিত হইয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। অনেকে মনে করিতে পারেন যে নেতাজীর মৃত্যুর পূর্বে এরূপ কয়েকটি বাণী বা ভাষণ রেকর্ড করিয়া রাখা হইয়াছিল- কিন্তু নেতাজীর “মৃত্যুর” অনেক পরে ক্যাবিনেট মিশনের গঠন হয়।

২। ‘চিকাগো ট্রিবিউন’ (Chicago Tribune) পত্রিকার বিশেষ সংবাদদাতা ও মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী মি. আলফ্রেড ওয়াগ বলেন: “১৯৪৫ খৃ. ১৮ আগস্টের পর বসুকে সাইগনে দেখা যায়।” এই সংবাদের সত্যতা অপ্রমাণ করিবার কোনো চেষ্টাই করা হয় নাই। রিপোর্টে ইহার উল্লেখ আছে (পৃ. ৯৮)। কিন্তু আমার সাক্ষ্যে যে-সব প্রমাণ দিয়াছিলাম তাহার উল্লেখ নাই। এ সম্বন্ধে পরে আলোচনা করিব।

৩। অনেক ঘটনা হইতে প্রমাণিত হয় যে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের কর্তৃপক্ষ নেতাজীর মৃত্যু সম্বন্ধে বহুদিন সন্দিহান ছিলেন। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু কোনোদিনই পুরাপুরি বিশ্বাস করেন নাই। শৌলমারির সাধুই নেতাজী এই বিশ্বাস যখন খুব প্রচারিত হইল তখন পণ্ডিত নেহরু শ্রীসুরেন্দ্রমোহন ঘোষকে পাঠাইয়াছিলেন ঐ সাধুকে দেখিয়া এ সম্বন্ধে সত্যাসত্য নির্ণয় করিতে। পণ্ডিতজী একখানি চিঠিতে লিখিয়াছেন যে নেতাজীর মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নাই। অধ্যাপক অতুলচন্দ্র সেনের এক চিঠির উত্তরে পণ্ডিতজী এই চিঠি লেখেন (*) এবং অতুলবাবু নিজে আমাকে ঐ চিঠিখানি দেখাইয়াছেন। অতুলবাবু আমাকে বলিয়াছিলেন যে তিনি ১৯৪৫ খৃস্টাব্দের অনেক পরে নেতাজীর সন্ধান পাইয়াছিলেন, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন এবং পুরানো অনেক ব্যাপার সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছেন। কোথায় তাঁহাদের সাক্ষাৎ হইয়াছিল আমি ইহা জিজ্ঞাসা করিলে অতুলবাবু বলিলেন যে তিনি ইহা গোপনে রাখিবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সুতরাং ইহা বলিবেন না। অবশ্য অতুলবাবু নেতাজীকে দেখিতে পারেন নাই- কারণ যে-কয়দিন তিনি সাক্ষাৎ করিয়াছেন একটি পর্দার আড়াল হইতেই নেতাজী কথা বলিয়াছেন- অতুলবাবু চাক্ষুষ তাঁহাকে দেখেন নাই। কিন্তু একটি ক্ষুদ্র ঘটনায় স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল যে অদৃশ্য বক্তা নেতাজী স্বয়ং। ঘটনাটি এই:

অতুলবাবু কলিকাতায় ফিরিয়া আসিয়া কয়েক দিন পরেই একদিন সকালে বৈঠকখানায় বসিয়া নেতাজীর সম্বন্ধে একখানি বই পড়িতেছিলেন- এমন সময় যে চাকরটি তাঁহার বিদেশ ভ্রমণের সঙ্গী ছিল সে চা লইয়া প্রবেশ করিল। অতুলবাবু বইখানি খোলা অবস্থায় উল্টা করিয়া টেবিলে রাখিয়া চা খাইতে আরম্ভ করিলেন। অতুলবাবু যেদিন নেতাজীর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ করেন- সে দিন কথাবার্তায় সন্ধ্যা পার হইয়া রাত্রি হইল। পর্দার আড়াল হইতে প্রশ্ন হইল ‘ঠাণ্ডা পড়েছে- আপনার সঙ্গে গরম আলোয়ান আছে তো?’ অতুলবাবু ‘না’ বলায় পর্দার ওধার হইতে বক্তা একখানি গরম চাদর ফেলিয়া দিলেন। পরদিন অতুলবাবু উক্ত ভৃত্যটিকে দিয়া চাদরখানি ফেরত পাঠাইয়াছিলেন। অতুলবাবুকে চা দিয়া হঠাৎ ভৃত্যের দৃষ্টি তিনি যে বইখানি উপুড় করিয়া টেবিলে রাখিয়াছিলেন তাহার মলাটের উপর নেতাজীর ছবির দিকে পড়িল। ছবিটি দেখিয়াই চাকরটি বলিয়া উঠিল: বাবু সেই যে সাধু বাবাজীকে আপনি গরম আলোয়ান পাঠাইয়াছিলেন এ তো তাঁহারই ছবি! অতুলবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, তোর ঠিক মনে আছে? চাকর বলিল: হ্যাঁ। এই ঘটনায় বোঝা যায় যে অতুলবাবুর সঙ্গে নেতাজীর দেখা হইয়াছিল পশ্চিম ভারতবর্ষের কোনো শীতপ্রধান স্থানে- কারণ নচেৎ এপ্রিল মাসে সন্ধ্যাকালে গরম আলোয়ানের প্রয়োজন হইতে পারে না। আরো প্রমাণিত হয় যে অতুলবাবুর সহিত যাঁহার দেখা হইয়াছিল তিনি নিশ্চিত না হইলেও খুব সম্ভবত নেতাজী। প্রকৃতিগত এই সাদৃশ্য এবং সুদীর্ঘকাল যাবৎ পুরানো স্মৃতিকথার অভ্রান্ত আলোচনা- এই দুইটি বিষয় স্মরণ করিলে নেতাজীর সহিতই যে অতুলবাবুর সাক্ষাৎ হইয়াছিল ইহা অবিশ্বাস করা কঠিন। এই সাক্ষাতের পরেই অতুলবাবু পণ্ডিতজীকে পূর্বোক্ত পত্র লেখেন।

প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিতজী লোকসভায় বলিয়াছিলেন যে নেতাজীর বিমান-দুর্ঘটনায় মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে। কেন্দ্রীয় সরকার যখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস রচনা করিবার জন্য ব্যবস্থা করেন আমি সম্পাদনাসমিতির অধ্যক্ষ নিযুক্ত হই। আমি কর্তৃপক্ষকে বলি যে প্রস্তাবিত ইতিহাসে নেতাজীর মৃত্যু সম্বন্ধে চূড়ান্ত ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাইলে আমাদের গ্রন্থে এ-বিষয়ে সুদীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হইবে না। ইহার ফলে এই প্রমাণটি আমি পাই- ইহা কয়েকজন (সম্ভবত দুইজন) আমেরিকান সৈন্যাধ্যক্ষের উক্তি। তাঁহারা লিখিয়াছেন যে নেতাজীর দুর্ঘটনায় মৃত্যু-সংবাদ শুনিয়া আমরা মনে করিলাম যে শত্রু হইলেও এই বীরের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত- যেহেতু আমরা এখানে উপস্থিত আছি। হাসপাতালে গিয়া দেখিলাম শয়ান নেতাজীর দেহটি সম্পূর্ণভাবে কাপড়ে ঢাকা- আমরা যথারীতি সৈনিক কায়দায় সম্মান দেখাইয়া চলিয়া আসিলাম। আমি এই বিবরণ পড়িয়া মন্তব্য করিলাম: সে দেহটি সম্পূর্ণ বস্ত্রাচ্ছাদিত ছিল সুতরাং ইহা যে কেহ ইচ্ছাপূর্বক নেতাজীর মিথ্যা মৃত্যু-সংবাদ প্রচার করিতে চায় তবে সে অনায়াসে এই কৌশল অবলম্বন করিতে পারে। সুতরাং এই সৈনিকদের বিবরণ নেতাজীর মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত প্রমাণ বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। ইহার কিছুকাল পরে পণ্ডিতজী বলেন যে নেতাজীর মৃত্যুর কোনো নিশ্চিত বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ নাই। ইহা আমার মন্তব্যের ফল কি না তাহা বলিতে পারি না কিন্তু পণ্ডিত নেহরু যে পর পর নেতাজীর সম্বন্ধে দুইটি বিরোধী মত প্রকাশ করিয়াছিলেন সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নাই। আর ভারতের জনসাধারণের চাপে দুইটি তদন্ত কমিশন নিযুক্ত করায় বেশ বোঝা যায় যে ভারত সরকারও এ-বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেন- পণ্ডিত নেহরু-কর্তৃক শ্রীসুরেন্দ্রমোহন ঘোষকে শৌলমারি সাধুর নিকট প্রেরণ করাও ইহার সমর্থন করে।

যে তিনটি কারণে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে বিমান-দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু হয় নাই তাহার উল্লেখ করিলাম। প্রথমে দুইটি আমি খোসলা কমিশনে সাক্ষ্য দিবার সময় বিস্তৃতভাবে আলোচনা করিয়াছিলাম এবং সরকারি উকিল (অথবা ব্যারিস্টার) আমাকে অনেক জেরা করিয়াছিলেন। তৃতীয়টি সম্বন্ধে খুব সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিই (৫ ডিসেম্বর ১৯৭২)। দুই বৎসর পূর্বের কথা আমার পরিষ্কার মনে নাই। তবে প্রথম দুইটি সম্বন্ধে আমি যাহা বলিয়াছিলাম তাহার সংক্ষিপ্ত নোট আছে।

আমি বলিয়াছিলাম যে যদি প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করাই কমিশনের উদ্দেশ্য হয় তবে ঐ দুইটির সত্যতা সম্বন্ধে ভারত সরকার চেষ্টা করিলেই সকল তথ্য সংগ্রহ করিতে পারেন। কিন্তু ছাপা রিপোর্টে কমিশনার খোসলা এমন অনেক সাক্ষীর উক্তি- যাহা স্বতঃই বিশ্বাসযোগ্য নহে- তাহার সুদীর্ঘ আলোচনা করিয়াছেন- অথচ আমার সাক্ষ্য সম্বন্ধে উল্লেখ মাত্র করেন নাই। তিনি যে-সমস্ত সাক্ষ্য আলোচনা করিয়া অবিশ্বাস্য বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন- তাহার তুলনায় আমার প্রথম দুইটি প্রমাণ অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য কিনা সে-বিচার পাঠকবর্গই করিবেন। এই দুইটি উক্তির একটিও প্রমাণিত হইলে নেতাজীর মৃত্যু-সংবাদ যে মিথ্যা তাহা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়- অথচ ইহার সম্বন্ধে শ্রীযুক্ত খোসলা একেবারেই নীরব। আমার সাক্ষী কীভাবে লিপিবদ্ধ হইয়াছে তাহা দেখিবার সুযোগ আমার হয় নাই তবে সাক্ষীর তালিকায় আমার নাম দেখিলাম। আমার পূর্বোক্ত দ্বিতীয় প্রমাণটি সম্বন্ধে রিপোর্টে (পৃ. ৯৮) অন্য আর-একটি সাক্ষ্যের প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে যে ওয়াগ সাহেবের উক্তি যে “১৮ আগস্টের পর নেতাজীকে সাইগনে দেখা গিয়াছিল” ইহা শোনা কথা মাত্র, আমেরিকার কোনো কাগজে প্রকাশিত হয় নাই। কিন্তু আমার সাক্ষ্যে স্পষ্ট বলিয়াছিলাম যে ইহা চিকাগো ট্রিবিউন (Chicago Tribune) পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। ইহার কোনো উল্লেখ রিপোর্টে নাই।

আমার প্রথম কারণটি অর্থাৎ নেতাজীর বেতার ভাষণ সম্বন্ধেও আর-একজন সাক্ষী প্রসঙ্গে কমিশন অনেক আলোচনা করিয়াছিলেন (পৃ. ৮২-৮৪) এবং যেহেতু সাক্ষী নিজে স্বকর্ণে উহা শোনেন নাই এইজন্য এই প্রমাণ অগ্রাহ্য করিয়াছেন। এই সাক্ষীটি বলিয়াছিলেন যে লন্ডন BBC-তে ইহা রেকর্ড আছে। একজন বাঙালি বন্ধু-লন্ডন BBC কর্মচারী- তাঁহাকে ভাষণের নকল দিয়াছিলেন। তাঁহার নাম জিজ্ঞাসা করায় সাক্ষী বলিলেন যে তাঁহার নাম বলিতে আমার সংকোচ হয় কারণ ‘ভারতবর্ষ’ (বাংলা মাসিক) পত্রিকায় ইহা প্রকাশিত হওয়ার ফলে তিনি চাকুরি হইতে বরখাস্ত হইয়াছেন। পরে অনেক প্রশ্নোত্তরের পর সাক্ষী বলিয়াছিলেন তাঁহার নাম কমল বসু। তিনি কোথায় আছেন তাহা বলিতে না পারায় কমিশন এই সাক্ষ্য অগ্রাহ্য করিলেন। খোসলাজী প্রথমে বলিয়াছিলেন যে উক্ত বন্ধুর নাম না বলিলে এই সাক্ষ্য প্রমাণ বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। পরে বলিলেন যে নিজে স্বকর্ণে শুনিয়াছে এমন লোকের সাক্ষ্য ছাড়া এই বেতার ভাষণ প্রমাণস্বরূপ গণ্য করা যায় না।

আমিও সাক্ষ্য দিবার সময় ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার প্রবন্ধের উল্লেখ করিয়াছিলাম- এবং ঐ প্রবন্ধেই আছে যে শ্রীযুক্ত চিন্তামণি কর ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’য় (১৯৫৫ সালে ২৩ জানুয়ারি সংখ্যায়) এই ভাষণের কিয়দংশ উদ্‌ধৃত করিয়া সত্যতা সন্দেহ করিলে আমি পণ্ডিত নেহরু ও আমেরিকার আইসেনহাওয়ারের সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধ করিতে প্রস্তুত আছি (may challenge Nehru or Ike to a Duel)। শ্রীচিন্তামণি কর এখনও জীবিত। সত্য নির্ণয়ের ইচ্ছা থাকিলে তাঁহাকে এ-বিষয়ে প্রশ্ন করিলেই জানা যাইত অথবা লন্ডনের BBC অফিসে ভারত গভর্নমেন্টের মাধ্যমে অনুসন্ধান করা খুবই সংগত ছিল। কিন্তু কমিশন এই পন্থা অবলম্বন করেন নাই- ইহার উপর টীকা অনাবশ্যক। কলিকাতা গভর্নমেন্ট হাউস-এর রেডিও মনিটারে উক্তির কথাও আমি পূর্বেই বলিয়াছি তাঁহার কোনো অনুসন্ধান করা হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না। কারণ কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণরূপে সাধারণ দেওয়ানি আদালতের বিচারের অনুযায়ী- অর্থাৎ বাদী ও প্রতিবাদীর দায়িত্ব সাক্ষী সংগ্রহ করিয়া নিজ নিজ দাবির সত্যতা প্রমাণ করা। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে কমিশন গঠিত হইয়াছিল তাহা সুষ্ঠুভাবে পালন করিতে হইলে দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত সত্যান্বেষী ঐতিহাসিকের দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ যদি সত্যের আবিষ্কারের কোনো সূত্র কোনোখানে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তবে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া যথাসম্ভব তাহার অনুসন্ধান করা। কমিশন এই নীতি অনুসরণ করিলে আমি যে দুইটি প্রমাণের উল্লেখ করিয়াছি হয়তো তাহার সত্যাসত্য নির্ণয় হইতে পরিত এবং নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যের উপর যবনিকাপাত না হইলেও নূতন আলোকপাত হইত।

পৌষ ১৩৮১

(*) চিঠিখানি এখন কাহার কাছে আছে আমি জানি না। – লেখক


সংযোজন – এই চিঠি সম্বন্ধে অন্যত্র বহু আলোচনা হয়েছে। তার একটি উদাহরণ এই লিঙ্কে পাওয়া যেতে পারে https://nehruarchive.in/documents/to-atul-sen-secret-protocol-on-subhas-chandra-bose-31-august-1962-knj6q

Related Post